Tuesday, May 05, 2009

রুচিরা ও হাওয়ার নাবিকগন

১.
‘কৃষ্ণচুড়া বিরহে উড়ে রাধাচুড়া চৈত্রের ধূলো
কোন শোকে পাতা ঝরে
ঝরে আমার বিষণ্ণতাগুলো ...’


আজ আবার আমাদের হাওয়ায় ভাসার রাত। এর আগে শেষবার আমরা হাওয়ায় ভেসেছিলাম বছর দুয়েক আগে। তখন আমরা আরো সবুজ, আরো নরম ছিলাম। আর নরম ছিলাম বলেই হয়তো সে সময় আমাদের সবার খুব চেষ্টা থাকত নিজেদের খুব শক্ত দেখাতে।
সে জন্য আমরা চোয়াল শক্ত করে শ্লোগান দিতাম, রাগী রাগী চেহারা করে ক্যাম্পাসে মহড়া দিতাম আর অন্য সবাইকে ভাবতাম আমাদের প্রতিপক্ষ । আমাদের কারো কাছে সত্যি সত্যি দু’একটা নিরীহ চেহারারঅস্ত্র থাকত। মাঝে মাঝে এগুলো উঁচিয়ে সত্যি সত্যিই কাদের যেন আমরা তাড়া করতাম।

সেই তখন, তখন আমাদের অনেক বন্ধু ছিল এবং অনেক শত্রু ছিল। আমরা সব বন্ধু এবং শত্রুদের কেউ কেউ এক হয়েছিলাম বছর দুয়েক আগের সেউ সন্ধ্যা য়। দিন তারিখ মনে নেই তবে মনে আছে- সে সন্ধ্যায় আকাশে চাঁদ ছিল না। দু’একটা তারা জ্বলবে কি জ্বলবেনা ঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারছিল না। আমরা গোল হয়ে বসে ছিলাম রিপন-কে ঘিরে।

বসেছিলাম ওদেরই দু’তলার ছাদে। ছাদে তখন বাতি ছিল না। বেশ দূরে স্ট্রীট লাইটের আলো এবং টুং টাং গীটার। রাসেল তখনো গীটার বাজানো ছেড়ে দেয়নি। শফিক খুব মনোযোগ দিয়ে মসলা বানাচ্ছিল। এখনো ওর মত চমৎকার মসলা কেউ বানাতে পারে না। তখন আমরা ওকে এম.ডি. ডাকতাম- ‘মাষ্টার অব ড্রাগস’।

এম.ডি. প্রথম স্টিকটা তুলে দিয়েছিল রিপনের হাতে। তারপর এক দম এক দম করে প্রত্যেকে। সে সময় বেশ তাড়াতাড়ি আমাদের ‘হাওয়া-যাত্রা’ শুরু হয়ে যেত। সবাই-ই যখন ভাসছিলাম সে সময় ছাদের সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে এসেছিল মঞ্জুর।
...তারপর অনেক রাতে বিদায় নিয়ে যখন ফিরছি কেউ কাঁদিনি। কেবল মঞ্জুর হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল রিপনকে জড়িয়ে ধরে। আমরা অবাক হয়েছিলাম অথবা আমাদের কারোরই তখন কোন বোধ ছিল না। কেবল আমার মনে পড়েছিল মাত্র ক’দিন আগে মঞ্জুর এল.জি. লোড করেছিল রিপনকে শুট করবে বলে।

পরদিন রিপন চলে গেল লন্ডন। মঞ্জুর ও গেল... আরো ক’দিন পর। রিপনে র ঠিকানা জানি। ২২ আগষ্ট ওকে কার্ড পাঠাই। মাঝে মধ্যে খুব ইচ্ছে হয় কিন্তু মঞ্জুরকে কিছু পাঠাতে পারিনা;
...ওর ঠিকানায় পৃথিবীর কোন ডাক পিয়ন পৌঁছাতে পারেনা ।


২.
‘সে মেয়ে সহজে
দু’ডানার ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে তোমাকেই খোঁজে
শুধু তার পাখি চোখ ভিজে উঠে সবুজ শিশিরে...’


আমরা তখন সংখ্যায় অনেক ছিলাম।
তারপর; এই অনেকের মধ্যে আমরা ক’জন- আমরা পাঁচজন ধীরে ধীরে বদলাতে লাগলাম। মিছিলে, মহড়ায়, হাওয়ায় আড্ডায় আমাদের ক্রমশঃ অনুপস্থিতি। আমরা নিজেদেরকে বদলাতে লাগলাম অথবা একজন আমাদের বদলাতে লাগলো।
সে হল রুচিরা। হঠাৎ করে কিভাবে যেনও আমাদের পাঁচজনের বন্ধু হয়ে গেল। তারপর আমাদেরকে বদলাতে লাগল। তাও নিঃশব্দে নয়, সশব্দে এবং প্রকাশ্যে । ওর সাথে বন্ধুত্ব রাখতে হলে নিয়মিত ক্লাশ করতে হবে- আমরা ক্লাশে শে হাজির ; রুচিরা চমৎকার ইংরেজী বলে, আমরা ভর্তি হলাম স্পোকেন ইংলিশের ক্লাসে। রুচিরা’র শখ হল কম্পিউটার শিখবে। ওর সাথে আমরাও একটা কম্পিউটার ইনস্টিটিউটে । কিসের আর কম্পিউটার শিখা। বরং আমরাি কম্পিউটারকে শিখাই আড্ডার যাবতীয় রকম সকম।

রুচিরা বোধ হয় জয়ীতা হবার স্বপ্ন দেখত। কিন্তু ও কখনো আমাদেরকে আনন্দ, সুদীপ কিংবা কল্যাণ হতে বলেনি। হয়তো বুঝতে পারতঃ আমাদেরকে দিযে ওসব হবে না। আশেপাশে কেউ কেউ প্রেম করত। আমরা হাসি-ঠাট্টা , বিদ্রুপ করতাম পৃথিবীর সমস্ত প্রেমিক প্রেমিকাদের নিয়ে; ‘আশার আলো’ রেন্ডুরেন্টে তিনকাপ চা ছয়জনের জন্য ভাগ করতে করতে রুচিরা বলেছিল- ‘তোদের জন্য এ জীবনে আমার আর প্রেম করা হলোনা’। সম্ভবতঃ আসিফ জিজ্ঞেস করেছিল 'কেন?' এ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলেছিল- ‘কেন আবার? যে মেয়ে পাঁচ পাঁচটা ছেলের সাথে ঘুরে বেড়ায় তার সাথে প্রেম করবে কে?’

এ বছর পহেলা জানুয়ারি আমরা ছ’জন মিলে বেশ একটা নির্জন চা বাগানে গেলাম। বাগানের ভেতর একটা চমৎকার লেক। লেকের জলে অসম্ভব সুন্দর নীল শাপলা। রুচিরা অবশ্য বলেছিল নীলপদ্ম । এরকম নীল শাপলা অথবা নীলপদ্ম আমি দেখিনি এর আগে। সে নাকি দেখেছে। জিজ্ঞে স করেছিলাম- ‘কোথায় দেখেছিস?’ ও বলেছিল- ‘স্বপ্নে। আমার নীল স্বপ্নে। আমার অনেক রংয়ের স্বপ্ন আছে , লাল স্বপ্ন, নীল স্বপ্ন। তোদের নিয়েও আমার একটা স্বপ্ন আছে। স্বপ্নটার রং হল...'

সেদিন আর স্বপ্নটার রং জানা হয়নি। আমরা একটা নৌকা পেয়ে গেলাম এবং নৌকা নিয়ে ঘুরলাম অনেক বেলা। টুকটাক অনেক কথা ও বলেছিল।
-যদি এখন নৌকা ডুবে যায়! আমি সাঁতার জানিনা যে,
পুলক বলেছিল- -কিচ্ছু হবে না আমি খুব ভালো সাঁতার জানি। তোকে ডুবতেই দেবোনা।
-আচ্ছা ধর, হঠাৎ ডাকাত এসে যদি আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়
আমি বলেছিলাম - কিযে বলিস তুই! আমরা বেঁচে থাকতে কেউ তোকে ছিনিয়ে নিতে পারবেনা।
- আর যদি আমার বিয়ে হয়ে যায়!


৩.
‘ঝিনুক নীরবে সহো, নিরবে সহে যাও
বুকে নিয়ে বালির বিষ, নিরবে মুক্তো ফলাও...’

আজ রুচিরার বিয়ে ছিল। আজ আমাদের বন্ধুর বিয়ে ছিল।
আমরা শেষ আড্ডা দিয়েছিলাম সাতদিন আগে ‘আশার আলো’য়। ঐদিন আমরা ছ’জন ছ’কাপ চায়ের অর্ডার দিয়েছিলাম। আমরা খুব মজা করতে চাচ্ছিলাম রুচিরাকে ঘিরে। আবীর আবার কোত্থেকে সাতটা লাল গোলাপ এনে দিয়েছিল রুচিরার হাতে- ‘অভিনন্দন বন্ধু !’
রুচিরা হেসেছিল। খুব হেসেছিল। হাসতে হাসতে হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। দু’হাতে মুখ ঢেকে রুচিরা কাঁদছিল। আমরা খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলাম, আমার ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছিল ওর মাথায় হাত রাখি। এমনিতে কতদিনই তো এমন করেছি। অথচ ঐদিন কিছুতেই হাত উঠছিলনা। কি একটা অস্বস্তি। কেউই আমরা বুঝতে পারছিলাম না কি করা উচিত। বুঝে উঠতে পারছিলাম না রুচিরার কান্নার রহস্য । ওরতো কোন প্রেম ছিল না। তবু কান্না কেন?
ওর সাথে আমাদের আর কথা হতে পারেনি। ও চলে গিয়েছিল। যাবার আগে বলেছিল- ‘আমার বিয়েতে তোরা কেউ যাবিনা!’

তবু আজ দুপুরে গিয়েছিলাম আমরা পাঁচজন। যখন কমিউনিটি সেন্টারে ঢুকছি ঠিক তখন মাইক্রোতে করে রুচিরাকে নিয়ে আসা হল পার্লার থেকে। ওকে কোনদিন তেমন করে সাজতে দেখিনি। মাইক্রো’র দরজা খুলে যখন ওকে নামানো হচ্ছে আমাদের পাঁচ জোড়া চোখ থমকে গেল, বিস্মিত হল। যেন আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না এই আশ্চর্য্য সুন্দর মেয়েটা আমাদের বন্ধু!
রুচিরা চোখ তুলে তাকায়নি তবু মনে হল যেন ও আমাদের দেখেছে। বর এল কিছুক্ষন পর। লম্বা চওড়া সুপুরুষ। তবু ব্যাখ্যাতীত কোন এক কারণে বরকে আমাদের কারোই ভাল লাগল না। বরকে দেখার পর পরই কেন জানি আমরা প্রত্যেকে কুঁকড়ে যেতে থাকলাম নিজেদের ভেতর। কিন্তু কেউ কারো কাছে ধরা দিতে চাইলাম না। খেতে বসলাম। কেউই খেতে পারলাম না। মনে হচ্ছিল যেন একটা প্রচন্ড বিরক্তি গ্রাস করছে আমাদের প্রত্যেককে।

কেউ কারো সাথে বলার মতো কোন কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমাদের কেউই তো হাবাগোবা গোবেচারা নই। দু'বছর আগেও লাল পাউডার আর এসিড মিশিয়ে ঝটপট ককটেল বানাতাম। এখনো পাঁচজন এক সাথে দাঁড়ালে...। তবুও নিজেদেরকে খুব অপাংক্তেয় মনে হচ্ছিল ঐ জমজমাট আসরে। আমরা বেরিয়ে আসছিলাম নিঃশব্দে । গেটের কাছে চলে এসেছি। এসময় খুব সাজগোজ করা একটা মেয়ে এসে দাঁড়াল আমাদের সামনে। তারপর আমাকে বলল- ‘রুচিরা আপনাকে ডাকছে’।


৪.
‘কে আর অমন কাক ডাকা ভোরে একা ফিরে আসে
আমি ফিরে আসি, আমি ফিরে আসি...একা!’


যেন দু’বছর আগের সেই সন্ধ্যা।
আজও আকাশে চাঁদ নেই। আজও তারাদের দ্বিধা। আমরা বসে আছি একটা টিলার উপর। আমাকে ঘিরে আমার চার বন্ধু । পুলক, আসিফ, আবীর, রাসেল। যে প্রশ্ন এরই মধ্যে কয়েকবার করা হয়ে গেছে, সে প্রশ্ন ওরা আবারো করল আমাকে। আমি অসহায় হয়ে হাতজোড় করে বললাম- ‘বিশ্বাস কর ভুলে গেছি। রুচিরা কি বলেছে, আমি মনে করতে পারছিনা।’
তারপর; আবারো নিঃস্তব্দতা। আসিফ মসলা বানাচ্ছে। আমার ড্রাগমাষ্টার শফিকের কথা মনে পড়ছে। অস্ত্র মামলায় সাত বছরের জন্য ও জেলে। ওর বদলে আমরা যে কেউ থাকতে পারতাম-যদি না ঐ জীবন থেকে আমরা পাঁচজন পালিয়ে আসতাম।

এবার আমরা গোল হয়ে বসি। আসিফ প্রথম স্টিক আমার হাতে তুলে দেয়। আগুন ধরাই। চোখ বন্ধ করি। কপালে দু’হাত ঠেকাই। প্রথমে ছোট করে, তারপর লম্বা এক টানে ধোঁয়া নিয়ে যাই ফুসফুসে, কিছুক্ষন আটকে রাখি তারপর ঠেলে পাঠাই মস্তিস্কে । কিছু বেরিয়ে যায় নিঃশ্বাসের সাথে। স্টিকটা পাচার করি বামে আবীর হাতে।
এবার কল্পনায় সেই পাখীটাকে ডাকি। দু’বছর আগে প্রতি সন্ধ্যায় ফুসফুসে ধোঁয়া ভরে আমি যে পাখী হয়ে যেতাম। গাংচিল, সোনালী ডানার শঙ্খচিল অথবা ঈগল। ওরকম কোন পাখী আমি সত্যি সত্যি আমি দেখিনি কোনদিন। তবু সে আসত আমার ভাবনায়। তার ডানায় রোদের ছায়া, গলায় অদ্ভুত নীল রং আর চোখে রাজ্যের নিঃসঙ্গতা। আমি সেই পাখী হয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠতাম। অনেক উঁচু উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের চুড়োয় মেঘেরাও উঠতে পারে না। মেঘের ভেসে বেড়ায় পাহাড়ের বুকে। আমি মেঘের ভেতরে ঢুকতাম তখন, দুডানায় জলের ছোঁয়া নিয়ে উঠে যেতাম উপরে, অনেক উপরে। কিন্তু কোনদিনই আমি পাহাড়ের চুড়ো পেরুতে পারিনি।

চারহাত ঘুরে স্টি্ক আবার আসে। আবার প্রণাম করি। পাখীটা এবার অবয়ব নেয়া শুরু করে। আমি সমস্ত আমাকে প্রবেশ করাই তার ভেতরে। এরপর শুরু করি দুডানায় ভর করে আমার অন্তরীক্ষ যাত্রা । খুব দরদী গলায় কে যেন গেয়ে উঠে- ‘আমার হইলোনাতো সুখের মিলন/হইলোনা শুকসারী দর্শন/এমনই কপাল’...-হয়তো আসিফ গাইছে। তবু মনে হচ্ছে দূরে, অনেক দূরে কোথাও কে যেন কাঁদছে। কে যেন ডাকছে। কে যেন কি বলছে আমাকে।
পাহাড় দেখছি এবার। পাহাড়ের মেঘ দেখছি। আমর দু’ডানা ভিজে যাচ্ছে, আজ আমি উপরে উঠব। অনেক উপরে। আজ পেরুবো সকল চুড়ো। ডানায় ক্লান্তি নামে। পাহাড় চুড়োয় যেন কার ছায়া। কে যেন বসে এখানে।

মঞ্জুর! আমাদের বন্ধু মঞ্জুর!। যে মঞ্জুর গুলি খেয়ে মারা গেল। যে মঞ্জুর মারা না গেলে মারা যেতাম আমাদের যে কেউ।
সেই রাতে ফিরছিলাম এই পাঁচজন আর মঞ্জুর। এ রকম এক জোৎস্না শূন্য রাতে হঠাৎ যখন ওরা হিট করল আমরা দিশেহারা হয়ে গেলাম। আমাদের কাছে কিছু ছিল না। আর আমরা টলছিলাম। কেবল মঞ্জুর কাছে একটা এল.জি ছিল এবং সে ঘুরে দাড়াল। এই সুযোগে পালালাম আমরা পাঁচজন। পরদিন হাসপাতালে সবার সাথে আমরাও মঞ্জু্রের লাশ দেখেছি। অথচ কাউকে কিচ্ছু বলিনি। বলিনি যে, আমরাও সাথে ছিলাম। মৃত্যু আমাদের তাড়া করছিল তখনো। এরপরই ঐ জীবন থেকে আমাদের প্রত্যাবর্তন অথবা পলায়ন।

পাহাড় চূড়োয় মঞ্জুরকে দেখে আমার প্রমিথিউসের কথা মনে পড়ে যায়। রুচিরা আমাকে প্রমিথিউসের গল্প শুনিয়েছিল। মানুষকে আগুন এনে দেয়ার অপরাধে তাকে নাকি আটকে রাখা হয়েছে কোন পাহাড়ের চূড়োয়। এই কি সেই পাহাড়? এই কি তবে প্র মিথিউস? কিন্তু ওর মুখে যে বন্দীত্বের কোন ছাপ নেই কেবল বিজয়ীর আভা। বরং আমিই সমস্ত ক্লান্তি নিয়ে বসে পড়ি ওর পায়ের কাছে। ও খুব নরম করে আমাকে বলে
- কিরে বেঁচে থাকতে কেমন লাগে?
আমি আরো ক্লান্ত হয়ে যাই। আরো অপরাধী হয়ে বলি;
- ‘ক্ষমা করে দে দোস্ত । তোর মতো আমাদের সাহস ছিল না মরে যাওয়ার’
মঞ্জুর হাসে।
- 'যারা মরতে জানেনা, তারা মৃত্যুর হাত থেকে ফেরাতেও জানেনা কাউকে’।

আমি বুঝিনা ওর কথা, আমি আবার পালাই। পেছনে হাসির শব্দ । বিদ্রুপের অথবা করুণার। আমি তবু উপরে উঠতে থাকি। আজ আমি সীমানা পেরুবই। আমার নিঃশ্বাসে শূন্যতা, মাথার ভেতর অনুরনণ- আমরা মরতে পারিনা, আমরা কারো মৃত্যু ঠেকাতেও পারিনা। কার মৃত্যু? আর কে মারা যাবে? আমার নিঃশাস বন্ধ হতে থাকে। ফুসফুস ব্যাকুল হয়ে উঠে।একফোঁটা নিঃশ্বসের জ্ন্য। সারা শরীর ভারী হয়ে আসে। আমার পতন হতে থাকে দ্রুত। নামছি দ্রত নামছি।
হঠাৎ আছড়ে পড়ি শক্ত মাটিতে। আমার ডানা ভেঙ্গে যায়। অসম্ভব ব্যথা। ব্যথা মানুষের স্মৃতি হরণ করে।ব্যথা মানুষের স্মৃতি ফিরিয়ে দেয়। মনে পড়ে। হঠাৎ আমার সবকিছু মনে পড়ে যায়। দুপায়ের উপর ভর করে উঠে দাঁড়াই। দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠি-
‘রুচিরা মারা যাবে। আমাদের কাপুরুষতার মুখে থুথু ছিটিয়ে রুচিরা মারা যাবে আজ রাতে। '

[মঞ্জুর... সত্যি আমাদের একজন ছিল। মঞ্জুর মারা গেল আগষ্ট ’৯৪-তে। সেই বেহিসেবী সময়ের অংশীদাররা কেউ ভুলিনি ওকে। ]


[ সহবাস- এর কোন এক সংখ্যার জন্য লিখেছিলাম '৯৮ এ]

নিঃশ্বাস, নীল অরণ্যে

‘ডেভলপমেন্ট ইকোনমিকস' -এর ক্লাসে ঘুম পাচ্ছিল হাসানের।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাস যে দিকেই গড়াক, নিজের আর পরিবারের আর্থিক সামর্থ ক্রমশ: তলানীতে এসে ঠেকছে- হঠাৎ মনে পড়তেই খুব শীত শীত করছিল হাসানের। ইচ্ছে করছিল সামনের ডেস্কের একেবারে কোণায় বসা প্রতীতির কাঁধে মাথা রেখে একটা লম্বা শ্বাস নেয়ার।

মায়ের অসুখটা ক্রমশ: বাড়ছে। জলের মত টাকা খরচ হচ্ছে। অনার্সের পর এম.বি.এ করার জন্য জমিয়ে রাখা বাবার পেনশনের টাকা এবার যাচ্ছে। তবু হচ্ছে না। হাসানের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আর নিঃশাসের সমস্যা হলেই প্রতীতির কাঁধে মাথা রেখে একটা লম্বা শ্বাস নেয়ার ইচ্ছেটা ও তীব্রতর হয়। আর সে মেয়েও হাসানের ইচ্ছে’র ঘ্রান পায়।
চোখের পাতা একটুও না কাঁপিয়ে যে ছেলে চোখে চোখ রাখতে পারে, একবার- কেবল একবার সে নাম ধরে ডেকে উঠতেই তো প্রতীতি হয়ে উঠতো তার অরণ্যের সবুজ।

কিন্তু কিছু কিছু পুরুষ সবুজ চেনেনা। বরং তারা অরণ্যের নীলে খোঁজে নিশ্চিত অবগাহন। কেননা সবুজকে তো আর সবাই ই সবুজ ডাকে!

ক্লাশের পর চার চাকার মোটযান ক্রমশ: দূর মিলায়-প্রতীতিকে নিয়ে।
পিছনে প্রযুক্তির বিষ- কালো ধোঁয়া।
নীল অরণ্যের পোষ্টম্যান হাসান-নিঃশ্বাসে আবারো কষ্ট ।

।।২।।
সূর্য জ্বলছে ।

বাড়ী ফিরতেই মৃদু গোঙানী। মায়ের। একরাশ নিঃশ্বাস অকারণে হারিয়ে যায়। ওঘর থেকে যন্ত্রণা ভেসে আসে।
কাঁধের ব্যাগটা রাখে। টেবিলের উপর-প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট, জীবনানন্দ। আবুল হাসান। যে কোন একটা পাতা খোলে আঙ্গুল
‘হলুদ সন্ধায় একা একা, আমি হায় কার অভিশাপে
এত নির্জনতা , বিমর্ষ স্তব্দতা এই আমার রক্তের, করছি কেবল পান’

বিছানার পাশে বাবা, বড় আপা, একজন বিব্রত ডাক্তার।
জ্ঞান নেই। চোখ বন্ধ। প্রচন্ড কষ্টে উঠানামা করছে বুকের হাপর।

হাসানের কেমন অদ্ভুত লাগে সব কিছু। পৃথিবীর এত আলো-তবু দৃষ্টি দিতে পারছেনা একজনকে। এত ভারী বায়ুস্তর । তবু নিঃস্বাস দিতে পারছেনা একজনকে। হুড়মোড় করে বাঁধ ভাঙে। প্রবল শোকার্ত বৃন্ডিপাত। হাসান থামতে দেয়না। যাক ভেসে যাক, ভেসে যাক সব। সে জানে জননীর এই তার শেষকৃত্য । এরপর যা হবে- সকলই আনুষ্ঠা নিকতা।

সন্ধ্যার পর সবাই গোরস্থান থেকে ফিরে। হালকা পাতলা শীত। মাথার ভেতর টলমল ক্লান্তি।

কাউকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এল নাকি হাসান?
গভীর রাতের কোন ট্রেন?
মাঝরাতে ময়লা চাঁদ লোহার ব্রীজ পেরোয়। ট্রেন আর বিশাল জল। মধ্যে থেকে জেগে উঠে পৌরাণিক মিথের মত কোমল শৈশব। যেন পরিত্রাণ আছে আজো, আছে ফিরে যাওয়া। হায়! যন্ত্রনার তীব্রতা জুড়ে ভাঙা কাঁচের আড়শী।

প্রিয় প্রতীতি, মৃত জননী অথবা চুরি হয়ে যাওয়া নিঃশ্বাস- কে যেন ডাকনাম ধরে খুব ডাকতে থাকে হাসানকে।
তবু তার ফেরা হয়না।

[ বোধ করি ২০০১ এ লেখা ]

তাকে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস



১।

দোলনচাঁপা আমার ভীষন প্রিয় ।
ভেজা পাঁপড়ি গুলো যেন প্রেমিকার চিঠি।
ঠিক এই মুহুর্তে অবশ্য আর কোন প্রেমিকার মুখ মনে পড়েনা।
কেবল বাসি দোলনচাঁপার ঘ্রানের মতো আমার শৈশব ফিরে ফিরে আসে।

বসত-ভিটার আঁচল ভিজিয়ে ছল ছল বয়ে যায় এক নদী। আমি আমার মায়ের কোলে চরে আরো কত পথ ঘুরে ঘুরে এসে বসত গড়ি এই নদী তীরে।
মাথার উপর এক বিশাল শূন্যতা। নাম তার আকাশ। রং তার নীল। এখানে সূর্য উঠেনা। সূর্য আসে সাতটি ঘোড়ার রথে চড়ে।

উনুনে হাড়ি চাপিয়ে ধোঁয়া আর আগুনের মাঝে সারাদিন বসে থাকে মা। হাড়িতে কেবল জল ফোটে টগবগ সারাদিন। আমার পেটে ক্ষিধে ফোটে টগবগ সারাদিন। ক্ষিধের চোটে কান্না আসে। জল ভর্তি হাড়ি থেকে কেবল ধোঁয়া বেরোয়। ভাত নয়।

অবশ্য কোন কোন রাতে এসে হাজির হন কোন কোন খলিফা। মা তখন জোর করে অন্ধকারে আমাকে খেলতে পাঠায়। খেলা শেষে ফিরে এসে দেখি হাড়িভরা সাদা সাদা ভাত। দোলন চাঁপা ফুলের মত সাদা। আর দেখি মায়ের শাড়ী ভরা লাল লাল দাগ। রক্তের মত লাল।

মা নিজ থেকে বলে- 'ভয় পাসনে খোকা, ওটা ভাতের দাম'

তারপর মা অনেকক্ষন নদীর জলে ডুবে থাকে।
অনেকক্ষন পরে উঠে এসে বলে-
:বলতো খোকা নদী কোথায় যায়?
: কোথায় মা?
: নদী সমুদ্রে যায় রে ছেলে ।
:সমুদ্র কি মা?
:যে সব পাপ ধুয়ে নেয়, সবার সব পাওনা ফিরিয়ে দেয় ।
: আমি বড় হয়ে সমুদ্র হবো মা ...


২।

ইদানিং আরেক হাসান, হাসানের ছায়া প্রায়শ:আমাকে চোখ রাঙায়।
: আজকাল বড় বিশ্রীভাবে তুমি নিজেকে গুটিয়ে
নিচ্ছো ।

: হ্যাঁ নিচ্ছি। মনে হয় আর মানুষ নেই । গুটি
পোকা হয়ে যাচ্ছি ।
: এসবের কোন মানে হয় না !
: হয়তো হয়, হয়তো হয় না ।

আমি আয়নায় নিজের চেহারা দেখি। ঠোঁটের কোনে ক্রুর হাসি যেন শয়তানের উল্লাস। নিজের কাছেই নিজেকে বড় অচেনা মনে হয়। আমার নির্মোহতার ছায়ায় প্রতীতির লাশ।
: আশ্চর্য! মেয়েটা তোমাকে সব দিয়ে যাচ্ছে। অথচ
তুমি তার কেউ না ।

আমি বেশ জোর গলায় নিজেকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলি
:আসলে আজকাল আমি কোন কিছুতেই আগ্রহ পাই না। না ভালবাসায়, না ঘৃনায় । সব সম্পর্ক গুলো বিমূর্ত মনে হয় । আছে , অথচ নেই ...

: ছি -তুমি এরকম। বিশাস হয় না!

আমি এবার হাতের কব্জি ঘুরিয়ে নিজের কাঁধে রাখি। বলি
: বিশ্বাস করতে শেখো। ঐ তাকিয়ে দেখো গাছের পাতাগুলো সব ক্রমশঃ হলুদ । লোভাতুর নদীর জলে ভাসমান মাটির প্রদীপ,
সাতটি সুরের ছিদ্র ভালোবাসার মগ্ন ধ্যান....

আরেক হাসান, হাসানের ছায়া এবার আঁতকে উঠে। চিৎকার করে বলে--
:থামাও এসব। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ।
:আমারো হয়। কষ্ট হয় বিশ্বাসে ,অনুভবে, প্রতীতি তে ...


৩।

নদীর নাম স্বপ্নভূক।

আমি বসে থাকি তার তীরে। নদীর জলে পাপ দেখি। ভাসমান পাপ, সমুদ্রগামী পাপ।
লাল, নীল, হলুদ।

আমারতো সমুদ্র হবার কথা ছিলো। সব পাপ মুছে দেবার,সবার সব পাওনা ফিরিয়ে দেবার আশৈশব প্রস্তুতি আমার।
কিন্তু ভাল্লাগেনা।

জলের ছায়াকে বলি---
:আচ্ছা জীবনটাকে বদলে ফেলা যায় না?
:হ্যাঁ যায় ইচ্ছে করলেই বদলে ফেলা যায় ।
:তাহলে চলো ।
:কোথায়?
: তুমি তোমার পরিনতিকে অস্বীকার করো।
আমিও সমুদ্র হবার বদলে উজান হেঁটে চলে
যাবো উৎস মুখে।
: কেন?
: আমি আসলে সব কিছু শুরুটা দেখতে চাচ্ছি ।

মাঘী পূর্ণিমার রাত শেষ হতে থাকে। আমি বসে থাকি একা। দেখি ভোরের একটু আগে আমার মা এর মতো অন্য কেউ আবারো ভেজে জলজ অনুতাপে।
পাপ ভেসে যায়।
আমিও ভাসতে থাকি ক্যানাবিস এর ধোঁয়ায়,উজান কিংবা ভাটিতে ।।


[ কবেকার লেখা? মনে করতে পারছিনা '৯৭, '৯৮ হতে পারে , প্রবল আক্রান্ত ছিলাম আবুল হাসানে । তার এক কবিতার নামে এই গল্প ]

ভ্রমন আনন্দময় হয়েছিলো

.

।১।

'ভালো থাইকেন ওস্তাদ'

ওস্তাদ তার পোকায় খাওয়া দাঁত বের করে হাসলেন । জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন । আমি ও হাত বাড়ালাম ।
অর্ধেকে নেমে আসা 'অফিসার্স চয়েজ' এর বোতলটা হাতে চলে এলো । ওস্তাদের শুভেচ্ছার নিদর্শন । বোতলের অর্ধেক শেষ করেছেন ওস্তাদ, কোম্পানীগঞ্জ বাজার থেকে ভোলাগঞ্জ আসতে আসতে । আমাকে ও দয়া করেছেন অবশ্য । পাশের সীটে নজু ছিল । নামাজী ভদ্রলোক ব্যাটা । নাক কুঁচকেছে এই যা ।
ট্রাকের পেছন থেকে লাফিয়ে নামলো আবীর আর পার্থ ।
ওস্তাদ ট্রাক ঘুরালেন ।

আমাদের চার জোড়া চোখ এবার ঘুরে তাকালো আদিগন্ত । বহুদূর থেকে যা ছিলো রহস্যময় নীল, এখন তা স্পর্শের সবুজ । যেনো চাইলেই জড়িয়ে ধরা যায় । এই তো খাসীয়া পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে তূলো তুলো মেঘ । পাহাড়ের পায়ের নীচে ছেঁড়া ছেঁড়া নদী, পিয়াইন তার নাম । শত শত মানুষ পাথর কুড়োচ্ছে । শত শত মানুষ, অথচ কি ভীষন স্তব্দতা । যেনো সবার জানা হয়ে গেছে, এই বিশালতার কাছে এসে এরকম স্তব্দ হয়ে যেতে হয় ।
এই স্তব্দতাকে মাখতেই আমরা ছুটে এসেছি শহুরে গালগল্প পেছনে ফেলে ।

ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারীর কাছাকাছি কোথাও নাকি একটা সরকারী ডাকবাংলো আছে ।আবীরের বাবা'র জানাশোনা ।
একজন কেয়ারটেকার এসে আমাদের নিয়ে যাবার কথা । তার নাম শামসুদ্দিন । শামসুদ্দিন কে আমরা চিনিনা । তবে শামসুদ্দিন আমাদের চিনে নেবে ।

শামসুদ্দিন আমাদের চিনে নেয় । মধ্যবয়স্ক লোক । তেলতেলে মুখ । মুখে লাগানো হাসি ।
আমরা তার পেছনে পেছনে এগোই । পাথর দেখি । ছোট ছোট পাথর, বড় বড় পাথর । পার্থ নীচু হয়ে পিয়াইনের জলে হাত দেয় । কবি মানুষ, তাকে এই সব মানায় । আমি ঘাড় ঘুড়িয়ে মানুষ দেখি । সারি সারি 'বারকী' নৌকা ।
মানুষজন ডুব দিচ্ছে। ডুব দিয়ে তুলে আনছে বড় বড় পাথর । পেশি বহুল মানূষ গুলো । আমার সুলতানের ছবির মানুষের কথা মনে পড়ে যায় ।
আমরা এগিয়ে যাই । একটা বাঁক পেরোই । পেরোতেই অদৃশ্য হয়ে যায় পাথর কোয়ারী, 'বারকী' নৌকা আর পাথর কুড়ানো মানুষ । এখন কেবল তীব্র সবুজ । ঘন জংগল । আর কি আশ্চর্য, সেই জংগলের ভেতরই ডাকবাংলো ।

কেয়ারটেকার শামসুদ্দিন আমাদের নিয়ে আসে ভেতরে । পুরোটাই কাঠের । তিনটে বড় বড় রুম । সব গুলোই খালি । আমরা দুই রুম দখল করি । চমৎকার বিছানা পাতা । এমন কি বাথরুমে গরমপানি । পেছনে টানা বারান্দা । বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই চোখে পড়ে দীর্ঘ বালিয়াড়ি । বালিয়াড়ির শেষে বেশকিছু কাঠের ঘর । ঘরগুলো যেনো ঝুলে আছে খাসিয়া পাহাড়ে । ওপাড়ে একটা পাকা সড়ক চোখে পড়ে । সাপের মতো পেঁচিয়ে উঠতে উঠতে হঠাৎ করেই হারিয়ে গেছে পাহাড়ের গহীনে ।

আমাদের সকলের চোখে মুগ্ধ বিষ্ময় । আর শামসুদ্দীনের ঠোঁটের কোনে গর্বিত হাসি, যেনো এই একাকী সাম্রাজ্যের সেই নৃপতি ।
শামসুদ্দীন চলে গেলে, আমরা চারজন এসে বারান্দায় দাঁড়াই । ডিসেম্বরের পাহাড়ী ঠান্ডা গায়ে লাগছে । হাল্কাপাতলা খিদে ও লেগেছে । কেয়ারটেকার নিশ্চয় খাবারের ব্যবস্থা করবে । জিজ্ঞেস করা হয়নি এখনো ।
আমি 'অফিসার্স চয়েজ' এর বোতল বের করি । গলায় ঢালি । নজু নাক কুঁচকায় । আবীর বড়লোকের ব্যাটা । সস্তা মদে আগ্রহ নেই । তবু হাত বাড়ায় । আবীরের হাত থেকে বোতল যায় পার্থ'র কাছে । কবি বলেই কিনা কে জানে, বড় নির্মোহ ভংগীমায় সে গলায় ঢালে । দ্বিতীয় চক্করেই বোতল উলটে গেলো আর আমাদের তিনজনের একসাথে মনে পড়ে গেলো- তুমুল মাতাল হবার এক ভয়াবহ পরিকল্পনা নিয়ে এসেছি আমরা এই অরণ্যে । এই এলাকায় খুব সস্তায় দেদারসে পাওয়া যায় ভারতীয় মাল । আমাদের মাতাল হবার নেশা চাগিয়ে উঠে দ্রুত ।
শামসুদ্দিন' কে ধরতে হবে ।
কিন্তু হারামজাদা গেলো কই?

।২।
শামসুদ্দীন ফিরে এলো ভুনা মাংসের ঘ্রান নিয়ে ।
রাত কতো হলো আমাদের কারোরই বোধ করি খেয়াল নেই ।ডাকবাংলোতে ডায়ানামোর আলো । বাইরে সবুজ জোছনা । জোছনা ও সবুজ হয় এমোন! খাসিয়া পাহাড়ের গায়ে থোকা থোকা আলো ।পাহাড়ীদের গ্রাম ।

শামসুদ্দীন ফিরে এলো টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার নিয়ে । বিনয়ের অবতার হয়ে জানালো সে বড়ো শংকিত -তার 'মুখ্যসুখ্য' বৌ এর হাতের রান্না আমাদের ভালো লাগবে কিনা?
খাবার মুখ্য নয় তখন, আমাদের পানীয় প্রয়োজন ।

তেলতেল মুখে শামসুদ্দীন হাসে
'মামারা বড়ো দিরং হয়ে গেলো । এত রাতে কই পাই? ঠিক আছে তবু একটা ঘুরান দিয়া আসি'
আমরা ও 'ঘুরান' দেবো শামসুদ্দীন । সবুজ জোছনায় মাতাল হবো আজ ।

শামসুদ্দীন হাঁটে । আমরা হাঁটি । ডিসেম্বরের পাহাড়ী ঠান্ডা গায়ে কামড় বসায় । আবীরের গায়ে লেদার জ্যাকেট । 'হারামজাদা শুয়োরের বাচচা', চৈতী কে তুই ছিনিয়ে নিবি জানি আমি । ঐ যে গায়ে জোছনা মাখছে নিঃশব্দে, পার্থ-কবি সে, কবি বলেই চৈতীকে হারাবে । আমি জানি, জানি এই সব ।

ধবধবে বালিয়াড়ীতে আমরা হাঁটতে থাকি । উথালপাতাল দিক শুন্য পূর ।শামসুদ্দীন পাওইনিয়ার । এই মাতাল রাতে তৃষ্ণার জল খুঁজে দেবে আমাদের!
একটা ঘুপচির সামনে এসে থামে সে । দেখে মনে হয়ে কোনো পাথর শ্রমিক থাকে । টিমটিমে কুপির আলো । আমি ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ফেলে আসা আলোকিত ডাকবাংলো দেখি । অর্থহীন ।
শামসুদ্দীন ঘুপচি থেকে বেরিয়ে আসে । মাথা নাড়ে । আমরা হতাশ হই ।কোন কথা নেই । কোনো কথা বলার নেই ।

ব্যর্থ পাইওনিয়ার ফিরতি পথ ধরে ।
আমাদের কেবল অনুসরন ।
এই তৃষ্ণার্ত রাত কতো দীর্ঘ হবে কেজানে?
ডাকবাংলোর আলো কাছে চলে এসেছে ।
শামসুদ্দীন একটুপিছিয়ে আসে । আমাদের কাছাকাছি আসে । গলা খাঁকারী দেয় । তেলতেলে হাসে ।
'মামারা, বোতল তো মিললোনা । কাইল ঐপার থাইকা এক কেইস আইনা দিমুনে । তয় এখন যদি--'
আমরা নিঃশ্বাস ফিরে পাই । ভরসা দাও কমরেড !
শামসুদ্দীন আবারো তেলতেলে হাসি ছুঁড়ে দেয়
'এখন যদি ইনজয় করতে চান, মনে লয় ম্যানেজ করতে পারুম । লাগাইবেননি?'
নজু নাক কোঁচকায় । একমাত্র সেই মাতাল নয় । বাকি তিনজন ঘাড় কাত করি ।

শামসুদ্দীন আবার হাঁটে । আমার আবার অনুসরন করি ।
একটা ভাংগা পাঁচিলের মতো । একটা ভাংগা দালানের কাঠামো ।টিমটিমে কুপির আলো । একটা শীর্ন হাত । নারী দেহের ছায়া ।
শামসুদ্দীন গলা খাঁকারী দেয় ।
ছায়া জিজ্ঞেস করে - 'কয়জন?'
আমরা নিঃশ্চুপ ।
তেলতেল মুখ বলে - 'চারজন'
ছায়ার দীর্ঘশ্বাস শুনি । ছায়া ফিস্ফিসিয়ে বলে-
'চারজনরে লাগাইতে দিলে, আগে আমার ভরপেট খাওন দেন '
তেলতেল মুখ হিসহিস করে- 'খাইয়া ল মাগী,আগে যে রান্না করলি রাখোস নাই কিছু? '
ছায়ার দীর্ঘশ্বাস আরো ধারালো শুনায়-
'না । বেবাক তো ডাকবাংলায় নিয়া গেলেন'

।৩।
রাত বোধ হয় ফুরোলো প্রায় ।
আবীর ঘুমোচ্ছে । ওর মুখে সুখী মানুষের ছায়া । ওর ঠোঁটের কোনে পাতলা হাসি । আবীর চৈতিকে ছিনিয়ে নেবে ।
বাথরুমে পানির শব্দ । নজু বোধহয় গোসল করছে কিংবা ওজু করবে । তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত হয়ে গেছে মনে হয় ।
পার্থ বালিয়াড়ীতে চিৎ হয়ে জোছনা মাখছে । হয়তো কবিতা বুনছে। এই ছেলে চৈতীকে হারাবে ।

আমি বারান্দায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ।
কারো কারো দেখে যাওয়া ছাড়া আর কোনো ভূমিকাই থাকেনা ।

[২০০৬ কিংবা ২০০৭]

এক সন্ধ্যার প্রশ্নমালা

বহুদিন পর ঠিক এই জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে আমি ।

আপাতঃ ঝক্ঝকে, বিত্তের ঝিলিক দেয়া আমার এই ক্লান্ত, মলিন, বিষন্ন শহরের এই হলো জিরো পয়েন্ট।
আচ্ছা জিরো পয়েন্ট মানে কি? এখান থেকে সবকিছুশুরু না এখানে এসে শেষ?
এটা কি নো ম্যানস লেন্ড?
কিন্তু এই বৃষ্টি মুখর সন্ধ্যায় আমি তো বেশ মানুষ দেখছি। দুপাওয়ালা মানুষ ।
নাকি ওরা কেউ মানুষ না, অথবা আমি নিজেই?কাফকার তেলাপোকা আমি, নাকি জীবনানন্দের দোয়েল ফড়িং, নাকি আমার মালটি ন্যাশনাল কোম্পানীর মালটিফর্মের চাকর?

যে পাশে দাঁড়িয়ে আছি তার উলটো পাশে তিনটে মেয়ে। তিনটেই মেয়ে। তিনটেই রমণযোগ্য। অতএব রমণী। নাকি মেয়ে মাত্রই রমণী?

হাত নেড়ে খুব ব্যাকুল হয়ে তিনজনই রিক্সা ডাকছে। কিন্তু একটা রিকশাওয়ালাও ঘুরে তাকাচ্ছে না। রিকশাওয়ালাগুলো এমোন নিরাসক্ত কেন? মেয়ে তিনটা তাদের রমণযোগ্য অথবা তারা মেয়েগুলোর নয় বলে?
একটা মোটর বাইকে তিনটা ছেলে। তিনটাই ঘুরে তাকাল। মেয়েগুলো তিন জোড়া চোখের লালসায় ধর্ষিত হলো।
ঠিক মাঝখানের মেয়েটার লম্বা গলার দিকে তাকিয়ে আমার আরেকটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস। ' লঘূ মরালীর মত মেয়েটিরে উড়িয়ে নেবে বিদেশী বাতাস'
এবার আমার চমকে উঠার পালা। কি আশ্চর্য্য, মাথার ফাঁক ফোঁকরে এখনো তাহলে দুএকটা লাইন রয়ে গেছে!

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে একটা গাড়ী এসে থামল। এই শহরে একটা বিদ্যালয় আছে, বিশ্ববিদ্যালয়। গাড়ীর পেট থেকে কয়েক ডজন বিদ্যার্থী নামলেন ।আমি যে রেষ্টুরেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওটাই 'তাহাদের' গন্তব্য । ওখানে বসে প্রেম হবে, শিক্ষা হবে, রাজনীতি আর অর্থনীতির হাতিঘোড়া হবে। ওদের দিকে তাকিয়ে আমি একপাল ছাগল দেখি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যার্থীগন আমলা হন। আমলাদের প্রিয় খাদ্য ঘুষ যেমন ছাগলের প্রিয় কাঁঠালপাতা।
আচ্ছা ছাগল এত কাঁঠালপাতা চিবোয় কেন?

রেষ্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আমাকে পাশ কাটাল একজোড়া কপোত-কপোতী। দুজনের গায়েই এপ্রোন , সম্ভবত:হবু ডাক্তার । একটা প্রশ্নের উত্তর আমি মেলাতে পারি না কিছুতেই। কসাই হবার জন্য বোকা ছেলে মেয়েগুলো এত পড়ালেখা আর এত সময় নষ্ট করে কেন?

বৃষ্টি থামছে।
ফিরে যেতে হবে আমার আপন গুহায়।
ফুসফুসের খুব গভীরে টেনে নিয়ে যাই প্রিয় বেনসন হেজেজের একটান নিকোটিন।
ধোঁয়া ধোঁয়া নিকোটিন, ধোঁয়া ধোঁয়া প্রশ্ন ।
চমৎকার ব্লেন্ড হয়ে উড়ে যায় আকাশে, প্রিয় শুন্যতায় ।।


[২০০২ এ সম্ভবতঃ লেখা । একটা ছোটকাগজের জন্য , নাম ভুলে গেছি ]

ইউটপিক

(ঋণ স্বীকার: কবি আবুল হাসান, যার নাম থেকে ঝরে পড়ে সমুহ বিষাদ)

আজকাল আর কবিতা-টবিতা পড়া হয়না একেবারেই।
আমার দশফুট বাই দশফুট রূমের দেয়াল ঘেষে একটা কাঠের শেলফ। বেশ পুরনো। ঘুন ধরে গেছে। ওর গর্ভে নির্বিবাদ পড়ে আছে কটা কবিতার বই। অযত্ন অবহেলায় । বিগত যৌবনা রমণী যেন। (যৌবন শেষ হলে কে আর রমণ করে?)

এতগুলো বইয়ের এত্তোগুলো কবিতা এখন আর বাঁধে না আমাকে। তবে এখনো একটা... না পুরো কবিতাও না, একটা লাইন, স্রেফ একটা লাইন থেকে এখনো মুক্তি পাইনি আমি ।

ছোট খাট চাকুরী করি। বলার মত কিছু না। একা মানুষ। মাসের ৩০ দিন মাথা নীচু করে হাঁটি। মাস গেলে বেতন পাই। বেতন পেলে ছুটে যাই শহরের ভেতর এক পাড়ায়। ওখানে এক রমণী তার শরীরের ভিতর আমাকে আশ্রয় দেয়, সারা মাসের অশ্লীল কষ্ট নিয়ে উপগত হই। অবশ্য এ জন্য বিনিময় মূল্য দিতে হয়।
যা হোক কথা সেটা না।

কথা হল এক লাইন কবিতা। যখন পূর্ণ বেগে ধাবমান আমি, শুরু হয়ে গেছে পিচ্ছিল যাতায়াত.. হঠাৎ মাথার ভিতর বেজে উঠে ঐ লাইন। যেন মৃত্যু ঘোষণা। প্রবল আক্রোশে ফেটে পড়ি। কবিতার শরীর খুঁজি। না পেয়ে আঁকড়ে ধরি নারীর শরীর। পাশবিকতায় নারী তৃপ্ত হয়। যে কোন নারী। সেও। বিশ্রী ভাবে শ্বাস নেয়, প্রশ্বাস ফেলে। স্বভাবজাত কপটতায় বলে উঠে ’তুমি একটা পশু, এত জোরে কেউ...!’
পশুরও পাপ বোধ জেগে উঠে রমণ শেষে। পাপ দিয়ে পাপ মোছন করতে হয়। এক বোতল সস্তা হুইস্কি নিয়ে ঘরে ফিরি। আমার একলা ঘরে। তরল আগুন ঢালি গলায়... হাওয়া হাওয়া সুখ। উড়ে যাবার প্রস্তুতি নেই। এমন সময় আবার আঘাত হানে ঘাতক শব্দমালা :
’ আমাদের অন্তর্গত রক্তে খেলা করে বিপন্ন বিস্ময়’

এক লাইন জীবনানন্দ এভাবে আমাকে নিয়ে কেবলই খেলা করে। একদিন আমিও খেলনা থেকে হয়ে উঠি খেলোয়াড়। প্রত্যেকটা শব্দ ভাঙি, গড়ি, বিন্যাস করি। হঠাৎ করেই হয়ে যাই আর্কিমিডিস। ইউরেকা! পেয়ে যাই মর্মার্থ। বিপন্ন বিস্ময়-- এ বিস্ময় তো বস্তুত সেই সর্বনাশ! রক্তের ভিতরের সুন্দর সর্বনাশ! শ্রম দাসের বিক্ষত পিঠের মতো চিরন্তন । পৃথিবী যতবার খুশী ঘুরে আসুক সূর্যের চারপাশ, উজাড় হয়ে যাক আমাজানের গহীন জঙ্গল,আবিস্কার হোক দারিদ্র্য বিমোচনের অব্যথ দাওয়াই। ঘোষিত হোক ফরমান ’স্যানেটারী ন্যাপকিন ছাড়া আর কোথাও রক্তপাত হবে না’ ...যত কিছু হোক যত যা কিছু, মানুষের রক্তে তবু থেকে যাবে এ সর্বনাশ।

যেমন রয়ে গেছে তুমি, তোমার স্মৃতি ।
যখন আমি লুকোচুরি খেলছি পসরা রমণীর সাথে, বুঝতে দিচ্ছি না কি সুখ আমি লুট করে নিচ্ছি তার শরীর থেকে, তখন হঠাৎ তুমি এসে দাঁড়াও ঐ কবিতার মত। এক বিরাট ছন্দপতন। আঙুলের নখগুলো বড় হচ্ছে,তুমি এসে দাঁড়াও। মনে পড়ে যায় কেমন যত্ন করে তুমি আমার নখ কেটে দিতে। ছুটির দিনে একলা ঘরে বন্দী হয়ে থাকি। মনে পড়ে এরকম একা ঘরে তুমি একদিন আমার জন্য রেঁধেছিলে ।

আসলে মানুষ বড় দুর্ভাগা জীব। কুকুরের তবু ভাদ্রমাস আছে। পরের ভাদ্রে পুরনো সঙ্গীকে মনে রাখার কোন দায় থাকেনা তার। হায় মানুষের তেমন কোন ভাদ্র মাস নেই। ঐ সর্বনাশ বারমাসই তাকে মনে করিয়ে দেয় সব কিছু। বার বার।


মাঝে মাঝে তোমারও কি মনে পড়ে না? বেরুতে বেরোবে। সাথে তোমার স্বামী। বারান্দায় দাঁড়ানো নতুন মডেলের গাড়ী। সামনে কত আনন্দ, পার্টি, পাঁচতারা হোটেল। গাড়ীর আয়নায় চোখ পড়তেই কি সব এলোমেলো হয়ে যায় না? মনে পড়েনা এরকম নীল শাড়ী পড়লেই একজন বিমূর্ত বিস্ময়ে তোমাকে দেখত - ? আহ্ সেই একজন!

আসলে প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব কিছু জটিলতা থাকে। এই আমি কখনো মাকে তেমন ভালবাসতে পারিনি যেমন বাসে সবাই, বাবাকে আমার ঘৃণা করার কথা ছিল কিন্তু কেন যে শেষ পর্যন্ত করুনা করতে শুরু করলাম? আর কেনই যে মানুষ পরস্পরের কাছে উন্মুক্ত করে তাদের পাঁজরের দ্বার। আমরাও কেউ ভিন্ন নই।
কেমন নিস্পাপ সরলতায় এসে বলতে-- ’রাতে ঘুম হয়নি’। বোকা বোকা গর্ববোধ হত -’বোধ করি আমাকে ভেবে ভেবেই!’ ।
পরে একসময় ফ্রয়েড পরে বোঝেছি তোমার তখনই পুরুষের প্রয়োজন ছিল,যেমন তেমন একখানা জ্যন্ত পুরুষ। আমি না হয়ে অন্য কেউ হলেও চলত। যেমন চলছে এখন। ’লিখতে এবং করতে আমার কোন ক্লান্তি নেই’। বলেছিল কবি আবুল হাসান। বেচারা! কোথায় এখন সুরাইয়া খানম।

এ সত্যটা এখন ভালই বুঝি কেউই যে অপরিহার্য নয় কারো জন্য। তবু রক্তের ঐ বিপন্নতা উলট পালট করে দেয় সবকিছু। সুখতাড়ানিয়া স্মৃতি, বোতল ভরা দহন আর জীবনানন্দ কবি- তিনজন মিলে হাজির করে ইন্সোমনিয়া, হ্যালুসিনেশন, ইউটোপিয়া...

এ জলা জংলার দেশ, মশা আর লোডশেডিংয়ের ডাস্টবিনটা হয়ে গেছে নন্দন কানন। চারদিকে সব উজ্জ্বল উচ্ছ্বল মানুষ। মঙ্গল গ্রহের রকেট ধরতে ছুটছে এক রঙ্গীন কিশোরী। পার্কে ছবি আঁকছেন পিকাসো, হোটেলে কবিতা পড়ছেন বোদলেয়ার আর রাজনীতি নিয়ে কথা বলছেন স্বয়ং সক্রেটিস। প্রতিটি দিনেই রয়েছে উজ্বল আলো আর মাতাল বাতাস এবং প্রত্যেক শহরের পাশেই একটা করে নিজস্ব সমুদ্র। এরকম একটা সমুদ্রের তীরেই আমি তোমাকে আবিস্কার করলাম আবার। তোমার পাশে অন্য কোন পুরুষ নেই। পরনে সেই নীল শাড়ী। কতদিন পর দেখা! কত বয়স হল তোমার? ষাট/সত্তুর/শত/হাজার বছর...? সময়ের নির্মমতা তবু স্পর্শ করেনি। তবু এক দ্রোপদ মনীষা নিজস্ব ভূগোলে। যেন সব প্রশ্নের উত্তর ওইখানে। তোমাকে স্পর্শ করিনা। কখনেই করিনি। বেলা ভূমিতে নতজানু হয়ে বসি।
শুধু বলি--’ তুমি ভালবাসা মানে বুঝো মেয়ে?/কোন গাণিতিক জটিলতায় তোমাকে বিক্রী হয়ে যেতে হয়?/ আর কেনই বা এই সব অবহেলা, দুঃস্বপ্ন ফিরে আসে বার বার? ’

তুমি কোন কথা বলো না। কেবল নিঃশব্দে হাসো। যেন ছেলেমানুষ আমি। অসহ্য লাগে, কে যেন আমাকে বলে দেয়
আসলে তুমিই আমার অন্তর্গত রক্তের সেই বিপন্ন বিস্ময়।

তোমার বিমূর্ত হাসি একটা দেয়াল গড়ে তুলছে। তোমাকে আড়াল করে ফেলছে ঐ দেয়াল। না আমি আর হারাতে চাই না। হাতের কাছে যা পাই ছুঁড়ে মারি ঐ দেয়ালে-অসহায় আমি।

কাঁচভাঙা আর্তনাদ গুমরে ফেরে আমার দশফুট বাই দশফুটে।
এই ভাবে প্রতিমাসে একবার রুটিনমত আমার নিজস্ব গুহায় সহবাস করি আমি, আমার স্মৃতি,স্বপ্ন, কষ্ট, ব্যর্থতা আর ভাঙা কাঁচের বোতল।


[ '৯৬ এ লেখা । আমাদে কাগজ 'সহবাস' এর প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল ]

Wednesday, July 16, 2008

তক্ষক

১।
আইপডটা কানে গুঁজে দেবো কিনা ভাবছি ।

নিতান্ত অভদ্রতা হয়ে যায়, কিন্তু কোনো বিকল্প খুঁজে পাচ্ছিনা । বয়স্ক ভদ্রলোক একটানা কথা বলে যাচ্ছেন ।
কথা বলা শুরু করেছেন অন্ততঃঘন্টা খানেক । আমি কিছুটা বিস্মিত ও হচ্ছি বটে । এই শীর্নশরীরের প্রায় বৃদ্ধ মানুষটা এতো কথা বলার শক্তি পাচ্ছেন কি করে?

যাচ্ছি ট্রেনে । এক জেলা শহরে চাকরীর ইন্টারভিউ দিতে । সুন্দর রোদেলা দিন । ট্রেনে ভীড় কম । জানালার পাশে বসেছি। পাশের সীট খালি ছিলো । চমৎকার বাতাস ।আইপডে লোপামুদ্রার গান । উপভোগ করছিলাম ।
প্রতীতির কথা মনে পড়ছিলো । পড়শু ডেটিং হলো আসিফের ফ্ল্যাটে । মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে । গল্প এখন শেষ পর্যায়ে । আমাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই,ছিলো ও না কোনোদিন । তবু হয়তো আমার মনে পড়বে প্রতীতিকে, প্রতীতির ও আমাকে মনে পড়বে কোনো অবসরে ।
প্রতিবার ডেটিংয়েই প্রতীতি আমাকে শরীর দেয় আর দেয় এক একটা চমৎকার কবিতার বই । ও মেয়ে নিজে কবিতা টবিতা পড়েনা কিন্তু আমাকে পড়ায় । সম্পর্ক হওয়ার আগে কোন একদিন বোধ করি ওকে জানিয়েছিলাম আমি, কবিতায় আমার প্রেমের কথা । আমার অনেক কিছুতেই পরে ও আর বিশ্বাস রাখেনি, কিন্তু এই অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারটা মনে গেঁথে রেখেছে ।

ব্যাগ খুলে কবিতার বইটা বের করি । জয় গোস্বামীর কবিতা সংগ্রহ । আমি জয়ের কবিতার তেমন ভক্ত নেই । বড্ড বেশী লিরিক্যাল । তবু এই ছুটেচলা রোদেলা দুপুর, প্রায় নির্জন রেলের কামরা, হুহু বাতাস- আমি প্রতীতির প্রতি প্রেম ও কবিতার প্রতি কামবোধে আক্রান্ত হই ।

আইপড খুলে গলায় ঝুলিয়ে রাখি । বিশ্রাম নাও লোপামুদ্রা। ইতঃস্তত পাতা উল্টাই । বিন্যস্ত অক্ষর ও ছন্দের সমাবেশ । একটা পাতায় চোখ আটকায়ঃ

' একফোঁটা রক্ত শুধু ঝরে পড়ল,মাটি ফেটে গেলো আঘাতে?
শিশুদের মরামুখ ভেসে উঠল কি একবার?
তা কেউ দেখেনি,বড় মেঘ করে এসেছিল ।
নইলে দেখা যেত এই ফাঁকা
খেয়াঘাটে
চাঁদ চেপে ধরে আছে রক্তে ভেসে যাওয়া নাড়ী তার ।'

কেমন । কেমন যেনো লাইনগুলো ।অকারনে আমার গা কেঁপে উঠে ।

২।
-'দেখলেন ঘটনা । এইবার কিন্তু খেলা জমবো । সব চোর ধরা পড়তেছে'
ভদ্রলোক আবার কথা শুরু করেছেন ।
তার কোলের উপর কটকটে হলুদ রংয়ের খবরের কাগজ । এই আরেক আপদ শুরু হয়েছে আজকাল । ত্রানের টিন,রিলিফের কম্বল,ঘুষের টাকা,তেরশো নদী,ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল গিলে খেয়ে ধরা পড়ছে বন কর্মকর্তা,পুলিশের দ্বিতীয়কর্তা,রানীমাতার জৈষ্ঠ্য সন্তান । আর এইসব নিয়ে সিনেমা সিনেমা গল্প জুড়ে দেয়া চায়ের টেবিল থেকে ট্রেনের কামরা পর্যন্ত । বিরক্ত লাগে । যন্ত্রনাময় দিনকাল ।
-'আল্লাহর রহমত ছিলো, তাই দেশটা বেঁচে গেলো । আগামী ২০ বছর সেনাবাহিনীর ক্ষমতায় থাকা দরকার,কি বলেন?'

আমি মনে মনে গালি দেই । 'মর্ষকামী ভোদাই পাবলিক' । এই সব পাবলিকের কারনেই হাঁটুতে ঘিলুওয়ালারা ছড়ি ঘোরায় । যখন তখন রাস্তায় কানধরে উঠবস করাবে তবু পাবলিকের প্রীতি দূর হয়না ।
মুখে কিছু বলিনা । খামোখা কথা বাড়িয়ে লাভ নেই । আর দিনকাল আসলেই খুব সুবিধার না ।

ট্রেনের গতি কমে আসছে । প্লাটফর্মে ঢুকতে আর খুব দেরী নেই । ভদ্রলোক কোমর উঠানো শুরু করেছেন । এবার তার ব্যাগ গোছানো শুরু করবেন নিশ্চিত । ট্রেন থামার আগেই দরজায় গিয়ে ভীড় জমাবেন, সেটা ও নিশ্চিত প্রায় । মনে মনে আরেক প্রস্ত গালি দেই ।
-'তা বাবাজী এসে গেলাম প্রায় । অনেক কথা বললাম । কিছু মনে করেননি তো । আমারো একটা ছেলে আছে । আপনার বয়সীই হবে । না , আপনার চেয়ে আরেকটু বড়ো'
অর্থহীন কথা । আমি আতংকিত হই । নতুন কোন গল্প শুরু হয় বোঝি ।
-'তবে আমার ছেলেটা আপনার মতো নয়'
-আমার মতো নয়, মানে?

নিজের অজান্তেই এই প্রথম আমি তার কথার জবাব দেই ।
-আমার ছেলেটা পংগু । একটা মাত্র ছেলেই আমার
সর্বনাশ । লোকটা এখন পংগু ছেলের গল্প ফেঁদে সাহায্য না চাইলেই হয় ।পোষাক আষাকে ভদ্রলোক যদি ও । বিশ্বাস কি? যা দিনকাল পড়েছে । আমার আর কথা না বাড়ানোই নিরাপদ ।

তবু কি আশ্চর্য! আমিই পালটা প্রশ্ন করি । আমার কন্ঠ কি কিছুটা আর্দ্র?
-দুঃখিত । কি হয়েছিলো ওনার? কোন অসুখ,কোন দুর্ঘটনা?
-দুর্ঘটনা? হ্যাঁ । তা দুর্ঘটনা ও বলতে পারেন
কি এক অদ্ভুত কারনে আমার খুব আগ্রহ হচ্ছে এই বৃদ্ধের পংগু ছেলেটার কথা জানতে ।
-বলুন না প্লিজ? কি হয়েছিলো?
-১৯৯০ । মনে আছে বাবাজী? বয়স কতো তখন? ১০/১২? আমার ছেলেটা তখন ১৮ । কলেজে পড়ে । আন্দোলন করে । আর্মি পিটিয়ে ওর কোমরের হাড় আর দুপা ভেংগে দিয়েছিলো। বুট দিয়ে থেঁতলে দিয়েছিলো ওর পুরুষাংগ'

আমি বেদনার্ত হই । অন্ততঃ হওয়া উচিত । একজন বাবার মুখ ঝুলে পড়েছে তার একমাত্র পুত্রের পংগুত্বের গল্প বলতে গিয়ে ।
কিন্তু আমি বেদনার্ত হইনা । এই বকবকে বুড়ো একটু আগেই বলছিলেন এই দেশে যেনো আরো ২০ বছর সেনা শাসন থাকে । এই বুড়োকে আমি মনে মনে গালি দিয়েছিলাম 'মর্ষ্কামী ভোদাই' বলে ।আমার এবার তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে গালি দিতে ইচ্ছে করে
-আমি দুঃখিত । কিন্তু আপনিই আগে বললেন অন্ততঃ আরো ২০ বছর সেনাশাসন দরকার । অথচ আপনার ছেলে ওদের হাতেই । আসলে আপনাদের মতো মানুষদের জন্যই...'

ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকছে এবার । গতি প্রায় থেমে এসেছে । বৃদ্ধ তার ব্যাগ গুছিয়ে হাঁটা শুরু করে দিয়েছিলেন । ফিরলেন । ফিরে এলেন আমার কাছে । আমার চোখে চোখ রাখলেন । কেমন ঘোলাটে । গা শিউরে উঠে । গলা নামালেন । হিসসিস করে বললেন-
২০ নয়, ২০০ বছর ধরে আমি আর্মির শাসন চাই । প্রত্যেক মা-বাবার একটা করে ছেলে গুলী খেয়ে মরুক নয়তো পংগু হয়ে পড়ে থাক বিছানায়, আমার ছেলের মতো ।

বাইরে চমৎকার রোদ । তবু কেনো জানি সহসা তীব্র শীতের কাঁপুনি আমার সমস্ত জুড়ে। গন্তব্য পৌঁছে গেছি । উঠা দরকার । উঠতে পারছিনা । পারছিই না আর ।


[ সচলায়তনে প্রথম প্রকাশিত । সচলায়তন গল্প সংকলন এ মুদ্রিত ]

Thursday, July 10, 2008

আদমের ঘর-সন্ন্যাস

(এই গল্পটা দশবছর আগের লিখা । পাপড়ি রহমান ছাপিয়েছিলেন তার সাহিত্যকাগজ 'ধূলিচিত্র' এ । এইরকম লেখা এখন আর লিখিনা অথবা লিখতে পারিনা আর।
তবু তো এ আমারই লিখা , তুলে রাখলাম তাই নিজের ব্লগে ।)



ক’দিন থেকেই এমন হচ্ছে।
ঘুম ভাঙতেই প্রচন্ড তৃষ্ণা পাচ্ছে, অথবা তৃষ্ণা পেয়েই ঘুম ভাঙছে ।
বিছানা থেকে প্রায় গড়িয়ে নামে হাসান। দেয়াল ঘড়িতে চোখ যায় দ্রুত। সকাল নটা বেজে কুড়ি। দরজার ছিটকিনি ভেতর থেকে নামানো। তার মানে ঘুম না ভাঙিয়েই রজব আলী চলে গেছে।
রজব আলী বাড়ি গেছে। রজব আলী বাড়ি যাচ্ছে মেঘনার বুকে ভেসে। আহ্ মেঘনা!
চোখের সামনে নদীটা ভাসতেই হাসানের মনে পড়ল বিছানা থেকে নেমেছে সে গলা ভেজানোর জন্য। টেবিলের ওপর রাখা জগটা উপুড় করে ধরল গলায়। এক সেকেন্ড... দু সেকেন্ড.. পানির ফোঁটা পড়ল না। প্রায় দৌড়ে এবার বেসিনের ট্যাপ ঘোরাল। নেই! ..হ্যালো ওয়াসা পানি নেই, ...মিষ্টার মেয়র আমার পানি নেই, ...জাতির ত্রাতাগন আমার জন্য একফোঁটা পানি নেই...।

হাসানের তৃষ্ণা বাড়তে থাকে। আর তৃষ্ণা মাত্রই তো বর্ধনশীল। একবার পেলে কেবল বাড়তেই থাকে। আকাশ-পাতাল দৈর্ঘ্যের তৃষ্ণা বুকে পায়চারি করতে করতে হাসান হঠাৎ লাথি বসাল শূন্য জগে। জগটা শূন্যে ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পড়ল ঘরের এক কোণে, সেখানে এক মানুষ সমান দৈর্ঘ্যের আয়না বসানো। আয়নাটা বড় শখের ওর।
শখের আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল হাসান।

আয়নার ভেতরে এক জীবন্ত স্লাইড। ওর চোখে চোখ রাখল সে। চোখ দুটো ক্রমশ তীক্ষন এবং দৃষ্টি কঠোর হয়ে যাচ্ছে। চোখের মণি আজকাল জ্বলজ্বল করে জ্বলে। আজকাল নিজেকে বেশ সু-পুরুষ মনে হয়। আগের সেই নরম নরম চেহারাটা ভেঙে কেমন যেন ধারালো হয়ে উঠছে। তবে বেশ শীর্ণ ও । শরীরে এক ফোঁটা মেদ নেই। এ নিয়ে অবশ্য কোনো দুঃখবোধও নেই ওর, হাসান ভেতরে আগুন ধারণ করে আর আগুন মাত্রই পোড়ায় সমস্ত মেদ, যাবতীয় বৈভব।

আয়নার ভেতরে স্লাইড বদলায়।
ঠোঁট টিপে নিঃশব্দে হেসে ওঠে এক কিশোরী। চৈতী এমন করেই তো হাসত। ওই হাসি আধ বোঁজা চোখ, ঠোঁটের ভাঁজ- এসব নিয়েই তো হাসানের প্রথম কৈশোর। যেমন সবারই থাকে। আসলে কমবেশি সব মানুষের গল্প তো সেই একই রকম। তবু কেন যে মানুষের এত মৌলিকত্বের, এত অনন্যতার আবদার। চৈতীর মেয়ে নাকি এখন স্কুলে যায়। সেই চৈতী, স্পর্শের আগেই যে কেঁপে উঠত। চৈতীর মেয়ে এখন স্কুলে যায়! হাসানের ভাবনায় চৈতী এখনো তবু সেই বেণী দোলানো কোমল কিশোরী । হাসান কথা বলে ওর সাথে
-চৈতী!
-উঁ!
-ফিরিয়ে দাও।
- কী?
- আমার কৈশোর।
- কী?
- তোমার দোলন চাঁপা।
- কী?
- তোমাকে দেয়া আমার আবেগের সমস্ত অনুবাদ
- কী?
- কিছু না। কিছু না গো মেয়ে। কিছু না!

হাসান ওকে ক্ষমা করে দেয়।

সাথে সাথে স্লাইড বদলায়।
এবার এক উচ্ছ্বল তরুণী। ঝলমলে একুশ বছর। প্রানোচ্ছল প্রতীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রোদ্দুর মাখা দিনগুলোর বেহিসেবী অংশীদার। প্রতীতির সাথে কাটানো ওই দিনগুলোতে সে বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে পারত। তখন ঘননীল হয়ে যেত আকাশ, বাতাসের গভীরে আরো স্নিগ্ধ হয়ে বইত বাতাস, কচি সবুজ ঘাসে ঢেকে যেত আদিগন্ত পৃথিবী। প্রতীতি যেন তখন এক লঘূ মরালী। হাতছানি দিয়ে হাসানকেও ডাকত ডানা মেলে একসাথে উড়বার জন্য। হাসান ওড়েনি তখন। তবে ডান ঝাপটিয়েছে। ডানা ঝাপটানোর শব্দে বুঝাতে চেয়েছে- ‘উড়তে আমি পারি। কিন্তু উড়ব আমার ইচ্ছেয়। কেবল আমার ইচ্ছেতেই’। প্রতীতি প্রতীক্ষা করতে চেয়েছিল, প্রতীক্ষা করেছিল ওর ইচ্ছের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন জানি ইচ্ছেটাই জাগেনি আর। আসলে ওসব ভালো লাগে না ওর, অন্ততঃ ভালো লাগত না তখন, জীবনটা যখন আরো বছর কয়েকের সজীব ছিল।
তখন মনে হতো প্রত্যেকটা মানুষ একেকটা নদীর মতো যে যার নিয়মে বয়ে যায়, কেউ কারো জন্য প্রতীক্ষায় থাকে না, থাকতে পারে না।হ্যাঁ হয়, কারো জন্য কারো হয়ে যায়। যেমন সমুদ্রে যেতে যেতে মোহনায় কোনো নদীর দেখা হয়ে যায় অন্য কোন নদীর সাথে। কিন্তু এ তো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা মাত্র এতে কারোরই কোনো কৃতিত্ব থাকে না।

তবে সাতাশ বছরের চৌকাঠ দাঁড়িয়ে ওসব একুশে দর্শনে ফাটল ধরেছে হাসানের। আজকাল মনে হয় -হয়তো পারে মানুষ, হয়তো ইচ্ছেটাকে আরো শানিত করতে পারলে । মানুষ হয়তো কিছুটা নদীর মতনই, কিন্তু নদী তো আর না। এসব ভাবনা শিরদাঁড়া হয়ে চিন্তায় প্রবেশ করতেই হাসান কথা শুরু করে আয়নার ভেতরের একুশ বছরের সাথে
-তোমাকে খুব মনে পড়ে প্রতীতি।
- মিথ্যে!
- সেই ১৩ নভেম্বর, ফরেষ্টহিল, ক্যাডবেরী চকলেট... সব মনে পড়ে।
-মিথ্যে!
-তোমাকে এখনো ভালোবাসি।
-মিথ্যে
- হ্যাঁ মিথ্যে । আমি কাউকে ভালোবাসি না, বাসিনি কোনোদিন। আমাকে নির্বাণ করে, এত জল ধারণ করে না কোনো সরোবর।

আয়নার ভেতরে প্রতীতির ছায়া ম্লান হয়ে যায়। হাসানের হঠাৎ জেগে ওঠা পুরনো অহং প্রতীতিকে মুছে দেয় সহজেই।

প্রতীতির বদলে এবার নতুন স্লাইড। আয়নার ভেতরে ঝলসে ওঠে টান টান যৌবন। মাংসল উদ্দামতা, লিপষ্টিকের হাতছানি।রক্তে বানডাকা সুগন্ধী... এবং উর্মিলা চৌধুরী। হাসান যে কোম্পানীতে কম্পিউটার অপারেটরের চাকরি করে মেয়েটা সেখানে শোভাবর্ধন করে। ভালো মাইনে পায় সে এবং ভারীক্কী একটা পদবিও আছে তার। ‘পি.আর.ও-পাবলিক রিলেশনস অফিসার’। হাসান অবশ্য বলে ‘বি.আর.ও-বায়ার রিক্রেশনস অফিসার’। সাদা চামড়ার, ভুঁড়িওয়ালা, চান্দিছিলা, যত বায়ার আসে সকলের রিক্রেশনের জন্যএই উর্মিলা চৌধুরী। সে যত আনন্দ বিলায় চেহারায় তত তার ঝিলিক বাড়ে, শরীরে তত বেশি আবেদন জাগে।

মাঝে মাঝে কম্পিউটার রুমে আসে সে এটা-ওটা প্রিন্ট করতে। যখন ফিরে যায়, আজন্ম তৃষ্ণা নিয়ে হাসান তাকিয়ে থাকে তার গমনে। এই উথাল-পাতাল আলোড়নে শরীরের ভেতর ভীষণ রকম জল ভাঙে। শরীর আজকাল ওকে খুব অসহায় করে ফেলে অথচ প্রতীতিকে বুকে জড়িয়ে রেখে ও কেমন শান্ত, স্নিগ্ধ, নির্মোহ হয়ে থাকতে পারত ও একুশ বছর বয়সে। সেই পবিত্র একুশে!
একুশ বছরকে মনে রেখে হাসান এবার চোখ তোলে আয়নার ভেতরে উর্মিলার আগ্রাসী ইমেজে

-খুব কি সুখ পাও মেয়ে, এই সবে?
-জানি না!
-কষ্ট কি পাও না কখনো?
- জানি না!
- স্নানের জলে হাত ডোবালে মাঝে মাঝে কান্না পায় না?
-জানি না!
আসলেই জানো না। আমিও তো জানি যে এসব জানো না তুমি, তোমরা কেউ। বাম পাঁজরের অন্তর্দহন, অনুভূতির বিবসন এসব তোমাদের জন্য নয়। পৃথিবীর সমস্ত বিষের বালি, নীল বুদবুদ কেবল আমাদেরই... কেবলই আমার।



[২]

ঘর থেকে যখন বেরোল হাসান, ছায়া তখন ঠিক পায়ের কাছে।
সূর্য জ্বলছে মাথার ওপর । সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকেই বুঝতে পারছে আজ আবার মাথার ভেতর ক্ষ্যাপামী শুরু হয়েছে- অনেক দিন পর। বয়স যখন আরো কম ছিল, পৃথিবীকে যখন আরো স্বপ্নময় মনে হতো, মনে হতো সব ‘সম্ভব-না’ গুলো ঠিক ঠিক একদিন ‘সম্ভাবনা’ হয়ে উঠবে- ওই রকম সবুজ সময়ে এসব ক্ষ্যাপামী প্রায়ই জড়িয়ে ধরত ওকে।
তুমূল আড্ডা, জোরালো যুক্তিতর্ক, হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি, শেয়ারবাজার, শমী কায়সার, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি... এরই মাঝখান থেকে সে হঠাৎ উধাও। গনগনে দুপুরে একা একা হেঁটেছে শহরের সমস্ত পথজুড়ে। কোনোদিন প্রতীতিকে নিয়ে সারাদিন টই টই, শহর ছাড়িয়ে দূরে কোথাও। ক্যাডবেরী চকলেটে কামড় বসিয়ে বলেছে- ‘দেখিস ক্যাডবেরী কোম্পানি যেদিন উঠে যাবে সেদিনও আমার দাঁতের কামড় রয়ে যাবে। যেদিন তুই অনেক দূরে চলে যাবি, সেদিনও তোর ভেতরে আমি রয়ে যাব।’ অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার আগের রাতে ছাদের ওপর গাঁজার আসর। ‘ধ্যাত ভাল্লাগছে না!’ বলে কমন প্রশ্ন ছেড়ে আসা এসব একজনকেই মানাত। কিন্তু সেই হাসান পৃথিবীতে নেই আজ, ক্ষ্যাপাটে পাগলামির ওই শহরটাও নেই, নেই সংগীসাথীরা কেউ।

যেন স্বর্গের বাগান থেকে নির্বাসিত আদিম পুরুষ সে। নিজেকে জেনে ফেলার অপরাধে বন্দী এখন এই ইট-কাঠ- পাথরের নোংরা নগরে। সপ্তাহে ছয়দিন কেটে যায় কি-বোর্ড, মাউস,প্রিন্টারে। প্রত্যেক ছুটির দিনে রুমমেট রজব আলী বাড়ি ছোটে তার আদরের টুনটুনি বৌ-র টানে। হাসানের কোথাও যাওয়া হয় না। এই একদিন সে ঘুমোয় নয়তো অমুক-তমুক চ্যানেলে রকমারি নাচ দেখে মাঝে মাঝে বাথরুমে যায়, শরীরটাকে একটু হালকা করে নেয়। চাকরিতে ঢোকার দুবছর থেকে এই হলো তার মোটামুটি জীবন যাপন। খারাপ কী, ভালোই তো যাচ্ছিল, কেন যে আজ আবার সেই পুরনো ক্ষরণ, রক্তের উন্মাদনা, ডাকপিয়নের হলুদ চিঠি। পাশ দিয়ে যন্ত্রদানব ছুটে যাচ্ছে। কালো ধোঁয়ার উৎপাত। জ্যাম, জট, মঘা ইউনানীর লিফলেট, গোপন অসুখের প্রকাশ্য ক্যানভাস, রিকশাওয়ালার ঝগড়া, গাড়িওয়ালার গালাগালি, ট্রাফিকের অসহায় বাঁশী- কিচ্ছু যায়-আসে না, আজ কিচ্ছু যায়-আসে না হাসানের।

পুরনো গুহায় ঢুকেছে সে আজ। শরীর থেকে খুলে ফেলেছে গজিয়ে ওঠা সামান্য আগাছা । সে জানে এর কোনো মানে নই। ‘কিসের কী মানে আছে হে?’ যা কিছুর মানে নেই তার মানেই খুঁজে বের করো’- কে যেন বলেছিল কথাটা। পৃথিবী জুড়ে এত কথা, যায় কোথায় এত কথা? মানুষের সমস্ত কথা নাকি ছড়িয়ে পড়ে ইথারে। ওখানে থেকে ফিরিয়ে আনা যায় না? যদি আনা যেত তাহলে ওকে দেয়া সবার সব কথা সে ফিরিয়ে দিত। ‘আমাকে এত কথা দেয়া কেন? আমি তো কাউকে কোনো কথা দেইনি কোনোদিন। আজন্ম সার্বভৌম আমি, কারো কাছে আমার কোনো দায় নেই। ঈশরের মতো নিঃসংগ ও অপরিবর্তনীয় আমি। যখন অনেক বন্ধু ছিল আমার, চৈতী ছিল, প্রতীতি ছিল, উর্মিলা আছে, যখন অমুক-তমুক থাকবে তখনো ঠিক এ রকমই রয়ে যাব আমি। কেউই কোনোদিন স্পর্শ করতে পারেনি, কোনো কিছুই বদলাতে পারেনি খুব গহীনের একান্ত আমাকে। বদলাতে পারেনি বলেই অর্থহীন ঘুরে বেড়াতে পারি এখনো, ঘুরে বেড়াতে পারি কোনো ধান্দা ছাড়াই।’

এই সব ক্ষ্যাপাটে স্বমেহন (!) হাসানকে টেনে নিয়ে যায় কালো পিচের রাস্তা ধরে। গনগনে রোদ মাথার ওপরে। পায়ের কাছে খাড়া ছায়া। বাম হাতে ওর ঘড়ি প্যাঁচানো আছে। আজ সারা বেলা অনন্ত ছুটি। ঘড়ি তো কেবলই বাহুল্য । বাহুল্য দ্বি-প্রহরের ক্ষুধা-তৃষ্ণা।
একটা বাহারী পোষ্টারে চোখে পড়ে ওর। প্রিয়ংবদা প্রিয়দর্শিনীর চিত্রপ্রদর্শনী, ‘প্রিয়ংবদা প্রিয়দর্শিনী’! বড়ই রঙিন নাম। দর্শনে প্রিয় না হলে কি আর বাজার মাত হয়?
পোষ্টারে আবার উদ্বোধকের নামটাও বড় করে ছাপা । নামটা পরিচিত নয়। হবে হয়তো কোন কুটনীতিক, মন্ত্রী কিংবা শিল্পপতি। ‘শিল্পী আর শিল্পপতি’ – বড় চমৎকার সহবাস হচ্ছে আজকাল। হবে না-ই বা কেন? পতিরাই তো ভোগ করবে শিল্প আর শিল্পীর শরীর।

হাসানের মনে পড়ে যায় এক সময় সেও লিখত। কবিতা- ভালোবাসাএবং দ্রোহের । তারপর এল গল্প- ছোট, বড়, মাঝারী। ‘আবার শুরু করলে কেমন হয়?’ মনে মনে ভাবে সে। অনেক দিন থেকেই ওর একটা গল্প লেখার ইচ্ছে। এক পথিকের গল্প। পথ চলতে চলতে সে পথিক পাথর কুড়োত। লাল পাথর, নীল পাথর, কাঁচা হলুদ রঙের পাথর, মাঠের ঘাসের সবুজপাথর। কুড়োনো পাথরে ভর্তি হলো তার জামার পকেট, কাঁধের ঝোলা। এরপর দুহাত, তারপর? তারপর পথিকের উদ্ভ্রান্ত সময়। সামনে এখনো অনেক ভালোলাগা পাথর, কিন্তু তার যে আর ঠাঁই নেই।

গল্পটা শুনতে গিয়ে ফিক্ করে হেসে ফেলে হাসানের ছায়া
-হবে না হে! তোমাকে দিয়ে গল্প-টল্প হবে না।
-কেন, হবে না কেন? আমি তো মিথ্যে লিখবো না, ওই পথিক তো চেনা আমার।
-তবু হবে না, তোমাকে লিখতে হবে টক-ঝাল-মিষ্টি, বালিকা প্রিয় প্যাকেট সাইজ গল্প, তবেই হবে।
- কী হবে?
-নগরে সুরম্য প্রাসাদ হবে, আকাশ চ্যানেলে তোমার গল্পের নাট্যরূপ হবে, সাজানো-গোছানো শিল্পকন্যাগণ তোমার সাথে লং ড্রাইভে যাবে দামি গাড়িতে চড়ে।
-কিন্তু সেই পথিক, তার কী হবে?
-সে তোমার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মরবে !


[ ৩ ]

উদ্যানে এখনো ছিটে-ফোঁটা বৃক্ষ আছে। বৃক্ষের শরীর কেটে বানানো বেঞ্চে হাত-পা ছড়িয়ে বসে হাসান। চাঁদ উঠছি উঠছি করে উঠছে না কেন জানি ।
আর, সে আসে। নিজস্ব ভথিতে। যেমন করে আসে তারা।

-‘নিবেন?’
একা ঘর। রজব আলী ছুটে গেছে তার টুনটুনি বৌ-এর কাছে। চৈতী, প্রতীতি প্রত্যেকে নিজেদের ঠিকানায়, উর্মিলা উত্তাপ ছড়াচ্ছে কোনো দামি রেস্তোরাঁয়।
হাসান কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? পকেটে হাত দেয়। টাকা আছে। ওটা থাকলে সবই তো হয়।
যে কাউকেই নেয়া যায় ইচ্ছে মতন। আর নেয়া মানে তো যাওয়াই । যাওয়া এবং আসা, যাওয়া-আসা। যাতায়াত, পিচ্ছিল যাতায়াত।
-সারারাত। কত নিবা?
-কয়জন?
-একা।
-দিয়েন!

হাসান একটি রিক্সা নেয়। চাঁদ উঠেছে। ঝিরঝির বাতাস। মেয়েটা ওর বাম পাশে। হাসান কখনো মেয়েদের বামে বসে না। মেয়েটার চুল একটু একটু করে বাতাসে উড়ছে। ভাললাগছে। ভীষণ ভালথাগছে। মনে হচ্ছে এই তো সবুজ সন্ন্যাস। এই তো গৃহ স্বর্গের বাগান। মাটির মোহর।
‘ কী নাম তোমার গো মেয়ে? চৈতী, প্রতীতি নাকি পপি, শাবনূর?’ নাম একটা হলেই হয়, না হলেই বা কী হয়। হাওয়ার নাম কে রেখেছিল? আদম! আদমের নাম? ঈশ্বর! ঈশরের নাম? মানুষ।
আমি মানুষ। আমরা মানুষ। আমাদের আর কোনো নাম নেই। নেই ভিন্ন অতীত। আমি আদিম পুরুষ। তুমি বিবি হাওয়া। আজ সারা রাত আমরা বিভোর হবো গন্ধমের নেশায়। আমরা সৃষ্টি করব প্রাণ। আমাদের সন্তানেরা মগ্ন থাকবে কৃষির সারল্যে। চিনবে না তারা শিকারের উন্মাদনা, হবে না তারা সভ্যতার সচ্ছল শিকার।

তিন চাকার স্বপ্নযান ছুটে চলে গৃহে,সন্ন্যাসে ।।

Monday, September 25, 2006

একটি কল্পদৃশ্য অথবা নিছক মৃত্যু

”...এসব জটিলতাই ঘূণ পোকা আমার।... মানুষ হিসেবে জম্ম নিয়ে মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে না পারার কষ্ট যে কি ভীষণ! কেন যে আমার কিছুই ভালো লাগে না! না নারী, না কাব্য, না চকচমকে ক্যারিয়ার... কিচ্ছু না! স্বপ্ন আর বাস্তবতার অসহ্য বৈপরীত্য আমাকে ভাঙে। কেবলই... নিজের ভেতর...”

ডায়েরির পাতা জুড়ে এভাবেই একজন সাজিয়েছিল নিজেকে এলোমেলো । এখন নেই।
লাশ হয়ে গেছে কাল রাতে। সাদা কাফনে মুড়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে সামনের উঠোনে। কালো গেট ঠেলে আসছে অনেকেই। জানা- অজানা, চেনা-অচেনা।

কে মন্ত্রণা দিয়েছিল ওকে এই সর্বনাশের? জীবনানন্দ না কায়েস আহমেদ, নাকি মায়াকোভস্কি-আত্নহননের নিপুণ শিল্পী? ২১টা সোনেরিল মুখে দেবার সময় করো কথা বুঝি মনে পড়েনি! মনে পড়েনি মাকে? যিনি ঈশ্বর ছিলেন ওর কাছে! অথবা আমাদের কাউকে? যারা বন্ধু ছিলাম...!

লাশটাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছে অপালা, ক্লাসের সবথেকে শান্ত মেয়েটা। এই লাশ একদিন অপালাকে বলতে চেয়েছিল ’--- তুমি কি আমার জন্য প্রতীক্ষা করবে? ’ কেন জানি বলা হয়নি। অথবা কি বলা হয়েছিল? নারী অধিকার নিয়ে ভীষণ সোচ্চার লীনা। খুব খুনসুঁটি হতো এসব নিয়ে। নয়নের কাঁধে মাথা রেখে লীনা এখন কাঁদছে। আর প্রতীতি! সবচেয়ে উচ্ছল মেয়েটা নির্বাক বসে আছে মুখ ঢেকে। ওর বুঝি সেই চিঠিটার কথা মনে পড়ছে যেখানে এই লাশ একদিন লিখেছিল ’---তুই আমার ওয়েসিস হবি? ভীষণ ক্লান্ত আমি। একটু ছায়া দিবি আমাকে? '

এসব একান্ত কিছু যে জানা ছিল আমার।প্রথম যেদিন বিতর্ক আর আবৃত্তি দিয়ে কাঁপিয়েছিল কলেজ অডিটরিয়াম- পাশে ছিলাম, প্রথম যেদিন গাঁজা খেয়ে চিৎকার করেছিল- ’নষ্ট হয়ে গেলাম!’ .. পাশে ছিলাম । প্রথম যেদিন একটু ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিল প্রতীতিকে, সেই নিজস্ব দিনেও তো পাশে ছিলাম।

আর আজ প্রথম যখন লাশ হয়ে গেলো, প্রথম যখন প্রবেশ করবে অনন্ত অন্ধকারে, তখন কি পাশে থাকবো না আমি?
আমার যে ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে ওই আত্নঘাতী কষ্টের স্বরূপ। নাকি এ কষ্ট অচেনা ছিল তার নিজের কাছেই? ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সব দেখি। লাশটাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গোসল দিতে। অন্তর্গত রক্তে আমার বিপন্ন ক্লান্তি। ঘুমোতে ইচ্ছে করে। ভীষণ। অনন্ত নিদ্রা। তন্দ্রার ভেতর আমাকে হাতছানি দেয় ২১টা সোনেরিল।


[ সম্ভবতঃ ১৯৯৬ এর কোন একদিন লেখা]

Saturday, July 22, 2006

শূন্যকড়চা

'দ্যাজ ইট্‌ । তোর কোন প্রব্লেম নেই আসলে '
যেনো রায় ঘোষনা করলো অরুনা ।
মেয়েটা আজকাল চশমা পড়ছে । আমি চোখ তুলে ওর চোখে চোখ রাখতে চাইলাম।
না! কেবল দৃষ্টি বিনিময়। ওর দৃষ্টিতে সবকিছু বোঝে ফেলার এক প্রবল আত্নবিশ্বাস।

আমি ঠোঁটের কোনে সেই বাঁকা হাসিটা ফোটাতে চাইলাম । বছর কয়েক আগে এই হাসি বিভ্রান্ত করতো কাউকে কাউকে। অরুনা কি ছিল তাদের একজন?
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম । রিলাক্স মুডে ।
'আমার তাহলে কোনো প্রব্লেম নেই । দ্যাজ গুড-'
--' নো, দ্যাজ নো গুড । দ্যাজ দ্যা রিয়েল প্রব্লেম ইনফ্যাক্ট। ডাক্তার বলছে তুই ম্যান্টালি,ফিসিক্যালি একদম ফিট । বাট ইচ্ছে করে কিছু সমস্যা তৈরি করছিস । ভয়াবহ সব সমস্যা । কিন্তু তুই পাগল ও না, ড্রাগ এডিক্ট ও না'
অরুনার কপালে ভাঁজ । আমি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এ সস্‌ মাখাই।
বাইরে মৃত আলো । শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেঁস্তোরায় গুমোট সময়।
ওর হাত আমার হাত স্পর্শ করে। বন্ধুর হাত । একসময় পালকের মতো প্রীতিময় ছিলো । আজ কেনো জানি বেশ ভারী মনে হয়।
--' তোর মতো ছেলের এসব পাগলামী মানায়না । যা হবার হয়ে গেছে । ইউ হেভ টু রিভাইভ । খালাম্মা ভীষন কষ্ট পাচ্ছেন'
মেয়েটাকে এবার আমার অসহ্য লাগে ।

এই মেয়েটা, আমি-আমরা ক'জন বিশ্ববিদ্যালয়ের বছর গুলোতে বুনো হাঁসের পালকের মতো সন্নিহিত ছিলাম । হায় পাখী উড়ে যায় ! ছায়া যায়! এক সময় পড়ে থাকা পালক ও হারিয়ে যায় ।
অরুনা ইংল্যান্ড গিয়েছিল এম,বি,এ করতে । ফিরে এসে মাষ্টারি করছে একটা বেসরকারি(বেদরকারি!) বিশ্ববিদ্যালয়ে।
মাঝে মাঝে তবু শরীর ফিরে আসে । সময় ফেরেনা কখনোই।
তবু বহুদিন পর আমি আর অরুনা আবার।
--' আমি লন্ডন থেকে ব্যাক করার আগে চৈতির বাসায় গিয়েছিলাম । জানিস তো মনে হয় ওর একটা ছেলে হয়েছে।
কি ভীষন কিউট একটা ছেলে '
মেয়েটা আমাকে স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছে । বেশ চালাক হয়ে গেছে দেখছি।
--' আচ্ছা চৈতির সাথে তোর সমস্যাটা কি হয়েছিল বলতো? এতো বছর প্রেম করে বিয়ে করলি অথচ বছর পেরোবার আগেই
সেপারেশন! ও তবু আবার বিয়ে করলো, লন্ডন গেলো আর তুই? চাকরী বাকরী সব ছেড়ে দিলি । আমি ওকে ও জিজ্ঞেস
করেছিলাম। কিচ্ছু বললোনা । আর তুই তো আমার একটা মেইলের ও রিপ্লাই দিলিনা'
আমি মুরগির ভাজা ঠ্যাং এ কামড় দেই।
অরুনা আমার হাতে চিমটি কাটে
--'কিরে কথা বলিস্ না কেনো?'

আমার ইচ্ছে করেনা । না অরুনা, না অন্য কারো সাথে । আমার যত শব্দ বুনন এখন কেবলি নিজের সাথে।
'চৈতির সাথে সত্যি কি কোনো সমস্যা হয়েছিলো আমার? ও তো ভীষন ভালো একটা মেয়ে । বিছানায় এবং ভালোবাসায় । তবু কেনো যে একদিন আমার মনে হলো-- এই তবে ঘর সংসার,বিয়ে ভালোবাসা! কেমন একঘেঁয়ে অর্থহীন সম্পর্কের জটিলতা । অপ্রয়োজনীয় সন্তান উৎপাদন। পৃথিবীর প্রতিটি নারী-পুরুষ তো আর কবিতা লেখেনা,মাঝরাতে বাঁধ ভেংগে গেলে সবাই তো আর প্রতিরোধে আসেনা, প্রত্যেকে তো আর ভালোবেসে জল ঢালেনা বৃক্ষের শিকড়ে । তাহলে প্রতিটি নারী-পুরুষের কি প্রয়োজন জনক জননী হবার?'

আমার নৈঃশব্দে অরুনা বিরক্ত হয় । অরুনা বেদনার্ত হয় আমার জন্য । অরুনা উপহাস করে আমাকে
--'তুই যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকিস কারো সাথে কিছু শেয়ার করবিনা, এ রকম মৌন হয়ে থাকবি তাহলে পাহাড় জংগলে চলে যা । গৌতম বুদ্ধ হয়ে বসে বসে ধ্যান করগে, যা '

হা হা হা । আমার হাসি পায়। অরুনার বিরক্তিতে আমার ভীষন হাসি পায় । হাসতে হাসতে আমি আমার নৈঃশব্দের ভাষায় ওকে বলি-
' অরুনারে কতো বুদ্ধ, কতো মুহম্মদ, কতো যীশু এলেন গেলেন । সমুহ বিপন্নতা থেকে তবু মানুষের পরিত্রান হলো কই? কতো দর্শন,কতো ধর্ম,কতো তন্ত্র তবু হত্যা,তবু ধবংস তবু হাহাকার'

রেঁস্তোরা ফাঁকা ছিলো এতক্ষন । হইহই করে এসে ঢোকলো একদল রংগিন ছেলে মেয়ে । ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসলো অনেকটুকু জায়গা নিয়ে । এরা বেঁচে আছে এখনো । আছে অর্থহিন বন্ধুতা ও ভালোবাসায় । আছে ক্লান্তিকর প্রেমে ও যৌনতায়।

আমি তবু ঝরাপাতার কান্না শুনি । যেনো হাঁটছি এক প্রান্তহীন শালবনের ভেতর দিয়ে। চরাচরে গভীর শুন্যতা । প্রান্ত্র জুড়ে অগনন ঝরা পাতা । ঝরছে আরো অবিরাম। আমি ইতঃস্তত হাঁটছি । পায়ের নীচে পাতা ভাংগছে।
স্মৃতি কাঁদছে। আমি ভাবলেশহীন।
কফির ধোঁয়া উড়ছে।

মুখোমুখি গন্তব্যহীন আমি ও অরুনা ।

Saturday, July 08, 2006

সে আর ফেরেনা

।।১।।
আজ সারাদিন এইভাবে কাটলো।

মেঘময়ুরী আকাশ।

কাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছে।বাতাসে এখনো ভেজা ঘ্রান।
বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় হাসান। বুকের ভেতরটা ভিজে উঠে।অনুমান করে দূর পাহাড় অঞ্চলে বৃষ্টি হচ্ছে।ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে দাড়ায় সে।পাড়ার মসজিদ থেকে ভেসে আসে আছরের আজান।মুয়াজ্জিনের কন্ঠে কেমন বিষন্ন ক্লান্তি।সন্ধ্যা ঘনাতে আরো ঘন্টা দু'য়েক।
এতটা সময় সে কি করে কাটায়?

নাটক পাড়ায় যেতে আজকাল আর ভাল্লাগেনা।বিজ্ঞাপন মেলেনা বলে নাটক নামেনা আর মঞ্চে।রিহার্সেলের বদলে ছেলেরা এখন ক্রিকেট খেলে।পুরনো নাটুকেরা এখনো আঁতলামো করে--কা কা , কাকের মতো।অবশ্য ওই পাড়ায় গেলে এখনো মেয়ে দেখা যায়।গাড়ি চড়ে আসে তারা।তারা সংস্কৃতি করে।তারা আরো কতোকিছু করে।তারা যখন ফিরে যায় গাড়ি, রাস্তায় তখন নামতে শুরু করে সস্তা রঙ চং মাখা ক্রয়যোগ্য রমনীগন।ঈ সব রমনীগ্নের কেউ কেউ শিল্পকন্যা গনের গমন পথে তাকিয়ে মুচকি হাসে। কে যে কাকে চিনে নেয়, কে জানে?

এসব ভাবতে ভাবতে হাসানের নিকোটিনের তৃষ্ণা পায়। এমনিতে ও চেইন স্মোকার না।আসলে কোনো কিছুতেই কেনো জানি ওর নেশা হলোনা কোনোদিন। না ধোঁয়া,না সূরা,না নারী। তবু এসব কিছুতেই ওর নিজস্ব পছন্দ আছে।ধোঁয়ায় বেনসন, সূরায় স্কচ আর নারীতে মধুবালা!
গলির মাথার খুপড়ি দোকান থেকে বেন্সন জ্বালিয়ে আলতো করে টান দেয় সে।কিন্তু এখন যাবে কোথায়? আশ্চর্য কোথাও যাবার মতো একটা জায়গা নেই এই শহরে! অথচ শহরটা বিশ্রী রকম বাড়ছে সাইজে। ভিতরে ভিতরে এক অবোধ অস্থিরতা।
অবশ্য হাসান জানে এই সীমানাটা পেরোতে পারলেই দিকছোঁয়া আবহে নীলপাহাড়ের হাতছানি।সবুজ সন্ন্যাসের মোহক নির্জনতা। অইখানে রঙ্গীন ফুল আর প্রজাপতি আছে,পাখীদের কাকলি আছে,বুনো গন্ধমাখা গা শিরশির অনভূতি আছে।তবু এই তাপ্পিমারা,ধূলিধূসর,জ্যাম-জটের অসুস্থ শহরটাই যেনো তার সর্বশেষ নিয়তি।চুড়ান্ত চারনভূমি। এর বাইরে আর কখনোই নয়। আজকাল প্রায়ই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। এই জীর্ন শহরটা কি এক অন্ধ আক্রোশে তার কন্ঠনালী চেপে ধরে। তখন বাতাসে নীল পাহাড়ের ঘ্রান। হাসান শূন্যে হাত-পা ছুঁড়ে। কিছুটা সুস্থতা চায় সে, স্বাভাবিক হতে চায়। কিন্তু এই ঘূর্নীর যে কোনো শেষ নেই। চারদিকে মাথা উচুঁ করে আছে পাষান দেয়াল, নিস্ক্রমন সম্ভবের অতীত।
-এসব অতিক্রম করতে চাইলে সে জানে একদিন নিজের কন্ঠনালী নিজেই চেপে ধরতে হবে,কিন্তু সেই সাহসের ইচ্ছে হ্য়না কেনো জানি। ছিটকে সরে যাওয়ার শক্তিটুকু ও নষ্ট হয়ে গেছে কোনো এক দূর্বিপাকের দিনে।

তবু মাঝে মাঝে স্বপ্নের ঘোরে ভেবে নেয় সে--হয়তো কোনো একদিন,কোনো এক করমচা রোদ্দুর দিনে, কোনো এক বিদর্ভ নগরে...............
বেন্সনের হাল্কা ধোঁয়ার আবহে সেমেটিক মিথের মতো এক পলকের রহস্য ছড়িয়ে ছুটে যায় একটা রিক্সা। রিক্সায় বসা ছিল অরু। হাসলে যার ডান গালে টোল পড়ে। চোখে যার জড়িয়ে থাকে ঘুম ঘুম নেশা।
'অরু- তোমার কাছে আর যাওয়া হলোনা' -ভাবে হাসান । হয়তো একদিনে তার গোপন ইচ্ছে ই-মেইলের মতো দ্রুত পৌঁছে যাবে অরুর স্বপ্নে।

-----আমি অরু ।
----অরুনিমা সান্যাল বুঝি? 'মনে পড়ে কবেকার অরুনিমা সান্যালের মুখ'
হেসে উঠে অরু । আহা যেন আমার হাতের ছোঁয়ার মাঝে রংধনু।
-----'ওঁহু । আমি অরু। শুধুই অরু। আপনি?'
-----'আমি হাসান । হাসান আরিফ । জানেন এই নামটা আমার একেবারেই পছন্দের না । যদি ব্দলে ফেলা যেতো তবে '
-----'তবে?'
-----'তবে আমি আমার নাম ব্দলে রাখতাম ফিদেইল জীব্রান । ফিদেইল ক্যাস্ট্রো আমার কাছে জীবন্ত সাহস আর জীব্রান
আমার প্রফেট'
-----'আপনি ত লিখেন?'
-----'আপনি তো তানপুরা বাজান? আপনাদের নেক্সট প্রোগ্রাম কবে যেনো?'
---- ' এইতো মার্চের তিন'

হাসান নিঃশ্বাস নেয়।
----' মার্চের তিন আমি পঁচিশে পা দেবো গো মেয়ে । মার্চের তিন আমি তোমাকে ছিনিয়ে নেবো '
কথা বলার ফাঁকে আয়নায় নিজেকে দেখার মতো করে অরুকে দেখে নেয় হাসান। ঢেউ তোলা একরাশ চুল নেমেছে কোমর পর্যন্ত। কপালে সবুজ টিপ । কলাপাতা রঙ শাড়ি। ম্যাচ করা আটসাঁট ব্লাউজ। ভেতরে দুধসাদা ব্রা'র টানটান বেষ্টনী । মনে হয় তার ,এই বেষ্টনীর আড়ালে জেগে উঠা অবোধ রহস্য--কেউ এখনো স্পর্শ করেনি।
---'আমি তোমার কাছে যাবো অরু । একদিন খুব নির্জন আর ব্যাক্তিগত সময়ে । তখনো আর কেউ যায়নি তোমার
কাছে । তুমি আমার জন্য প্রতিক্ষায় থেকো ।'



।।২।।

এপয়েন্টমেন্ট লেটারটা হাতে পেয়ে বিমুঢ় হয়ে যায় হাসান ।
বিস্ময়ে , আনন্দে ।...শেষ পর্যন্ত হচ্ছে তাহলে!
এই শহর সে ছেড়ে যেতে পারছে । সে জানে এই শহর ক্রমশঃ আরো ভয়ংকর হয়ে উঠবে । এখন ই এই শহরে জ্যান্ত মানুষ পোড়ানো হয়, রাজপথে খুলে নেয়া হয় মেয়েদের শাড়ি । অচিরেই মায়েরা ধর্ষিতা হবে সুপুত্রদের দ্বারা, ষোড়শী সুন্দরীদের মাংস বিক্রী হবে কেজি দরে । হাসান জানে, হাসান জেনে গেছে এই মৃত শহরের ভবিষ্যত । যে মরে গেছে , দুর্গন্ধ ছড়ানোই তার পরিনতি, আর কিছু নয় ।
হাতে ধরা কাগজটাকে সে চুমু খায় , যেন প্রেমিকার ঠোঁট । এই কাগজ তার সামনে খুলে দিয়েছে এক অমৃত সম্ভাবনা ।

...হাসান যাচ্ছে বিলাসপুর ।
শহর থেকে অনেক দূরে ছোট্র আদিবাসী গ্রাম । আঁকাবাঁকা লাল্ মাটির পথ । আর একটা চমৎকার হ্রদ । হ্রদের জল স্বপ্নের মতো নীল । ঘুম ঘুম চোখে আদিবাসী শিশুরা আসবে স্কুলে । ওদের চোখ এখনো আকাশের মতো সজীব । গাদাগাদা বই আর কম্পিউটার গেমসের অভিশাপে মরে যায়নি ওরা ।
হাসান ওদের বর্নমালা শেখাবে । জানাবে রক্তাক্ত বর্নমালার ইতিহাস । টারবোম্যান,সুপারম্যানের ফ্যান্টাসী নয়, হাসান ওদের বলবে আসল নায়কের গল্প । জগতজ্যোতি নামের এক কিশোর যোদ্ধা কি করে একা একা যুদ্ধ করেছিল হানাদারদের বিরুদ্ধে অথবা শহীদ সোলায়মান--চলন্ত জীপের পেছনে যাকে বেঁধে টেনে নিয়েছিল ঘাতকেরা তবু সে সহযোদ্ধাদের ঠিকানা বলে দেয়নি ।
বেশ আগে একদিন ও একা একা বিলাসপুর ঘুরে এসেছিল । তখন দেখেছে ওখানে ময়ুর পেখমের মতো সব পর্দা উঠে যাছে । মাটির দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে গভীর নীল আকাশের চুম্বন । খুলে যাচ্ছে কোন এক গভীর গোপন পবিত্র উৎসব রাত্রির সুখ- যেনো একটু পর শুরু হবে ঘুরে ঘুরে গোল নাচের মৃদু ও নম্র আসর ।
হ্রদের কিনারে একা খাড়া উচুঁ এক টিলা । টিলার উপর ছোট্র বাংলো । বাংলোর টিনের চালা হ্রদের জলের মতোই নীল।
বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসলে হ্রদের জল আর শূন্যতা ছাড়া কিছুই থাকেনা । এটাই হবে হাসানের নিজস্ব আবাস । চার দিকে ছড়িয়ে থাকবে জলতরংগের টুংটাং আর আয়ুহীন বিস্ময় ।
আর এসবের মাঝখানে এসে অরু বসবে , কালাতীত সময় ব্যাপে বিমুর্ত ভংগীমায় । তার মাথার উপর নীল আকাশ, পায়ের নীচে নীল জল আর পরনে নীল শাড়ী । কোলের উপর তানপুরা । কোন এক ঘুম ভাংগা রাত্তিরে প্রান পাবে এই ছবি । নারী তার চোখ বোঁজে কনকচাঁপা আংগুল ছোয়াবে তানপুরার তারে, নিঃসীম ঘুমকাতর পৃথিবীতে নামবে অলৌকিক সুরের বৃষ্টি ।

হাসান বড় সন্তর্পন প্রতীক্ষায় দিক কাটায় ।

ভোর রাতের দিকে ঘুম ভেংগে যায় জলতেষ্টায় ।
তারিখটা কত আজ? আঠার নাকি উনিশ? আঠার হলে আরেকটা চাকরীর ইন্টারভিউ ।
একটা N.G.O তে । ডিগ্রী পাশের কলা পাতাটা চিবিয়ে চৌদ্দ ঘন্টার দাসত্ব । মাস শেষে সাড়ে চার । তাও একটা পোষ্টের জন্য আল্লাহ্'র আরশ পর্যন্ত লম্বা লাইন । শালার দেশে একটা মড়ক লেগে মরতে পারেনা দু'চার কোটি? অথবা সব পুরুষেরা হ্যে যাক নপুংশক । পেটে ভাত নেই তবু এতো উৎপাদন!

এই আঁধোছায়া ভোরে মনটা বিষিয়ে উঠে হাসানের ।
তার থেকে তো এই ভালো কোনো এক অচেনা অরু আর অজানা বিলাসপুরের স্বপ্ন দেখা ।

দুরের মসজিদে ভোরের আজান ।
হাসান পাশ ফিরে আবার স্বপ্নে ডোবতে চায় ।
এই সময়ের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয় !

[ কবে লিখেছিলাম? ২০০১ নাকি ২০০২ নাকি আরো আগে? ]


Monday, June 26, 2006

তীর্থ,ত্রিমাত্রিক


আমি যেতে চাইনি।
আমি যেতে চেয়েছি।
আমি গিয়েছি......
পরিনতিটাই তো চুড়ান্ত সত্য । যা ঘটল শেষ পর্যন্ত।
'হতে পারতো' 'হওয়ার কথা ছিল' এসব তো ব্যবহৃত টিস্যু পেপারের মতো ফাঁপা নিঃশ্বাস।
কতো কথা,কতো কথা দেয়া।আরো কতো কথা নেয়া।

তারপর...?
জীবন দাস কবি । থাকে শুধু অন্ধকার।
যে বৃক্ষের নীচে পাঁজর বদলে নিতাম পরস্পর,তার ডালপালা এখন ক্রমশ মৃয়মান। মাঝে মাঝে নিজেকে শকুনের মতো মনে হয় । একে একে সবাই পাড়ি জমাচ্ছে পাউন্ড ডলারের বেহেশতে।আমি একা এক হরিদাস পাল আটকে আছি এই মৃত ভাগাড়ে।

সেদিন চামেলীকে দেখলাম।মেয়ে নেই আর।মাশাল্লাহ মহিলা হয়ে গেছে গায়ে গতরে।সোনাদানা গায়ে লেপ্টে রিক্সার ঘোমটা তুলে যাচ্ছে কোথাও ।পাশে এক মাঝ বয়সী মধ্য শ্রেনীর লোক।ওর স্বামী নিশ্চয়।চামেলীর বিয়েতে আমরা গিয়েছিলাম।কিন্তু লোকটার চেহারা মনে নেই। আচ্ছা বিয়ের পরে লোকজন বউ নিয়ে ঘোরতে বেড়োলে রিক্সার ঘোমটা তুলে কেনো? বিবাহিত জীবনের অশ্লীলতা গুলো আরো আড়াল করার জন্য?
এই চামেলীকে তুমি ভয়াবহ সতর্ক করে দিয়েছিলে যেনো আমার কাছ না ঘেঁষে।এই নিয়ে ক্লাশে কতো হাংগামা!
আর সেই প্রথম জানলাম চামেলী আমার কাছ ঘেঁষতে চেয়েছিল,সেই প্রথম জানলাম তুমি আমাকে ভালোবাসো?
সেই তুমি এখন?----ব্যবহৃত টিস্যু পেপারের মতো ফাঁপা নিঃশ্বাস।

আর আমি তখন ভূগছি গোপন অসুখে।বোধের এবং মননের।
ক্লাশের শেষ ডেস্কে বসে টু ফাইভ সিগ্রেটের ফাঁপা শরীরে ঢুকাই মোহিনী গুঁড়ো।টান দিয়ে বন্ধুরা দেখে ড্রেস করা মাংসের পেকেট আর আমি ধরি বাতাস থেকে মোহময় শব্দ গুচ্ছ। শব্দ দিয়ে বাক্য গাঁথিঃ
'নোংগর তুলে নিলে নরোম মাটির বুকে থেকে যায় দাগ
মাটি না নোংগর,কার বুকে জন্মায় এতো অনুরাগ?'
আমি আমার বুকে এই দগদগে দাগ টের পেলাম,যাদিন নোংগর উঠে গেল বুক থেকে তুমুল আনুষ্ঠানিক্তায়।
এর আগে টের পাইনি আমি।
একদিন ও না!

কেননা এর আগেই ভেংগে পড়েছে বার্লিনের দেয়াল,মহামতি লেনিনের তর্জনী ভূপাতিত,সমাজতন্ত্রীদের যৌনক্রিয়ায় ব্যাপক তৃপ্তি দিচ্ছে ইউনাইটেড স্টেট অফ ভয়ংকর আমেরিকার কার্যকর ভায়েগ্রা।
আর তারো আগে প্রথম কৈশোরেই কি করে যেন আমার জানা হয়ে গিয়েছিল--সাম্যবাদ আর পুঁজিবাদের মধ্যে যুদ্ধ যদি বন্ধ হয়ে যায়, যদি ভালোবাসা আর ঘৃনার ভিন্ন মানে না থাকে--তাহলে মানুষ আর বসত গড়বেনা মানুষের বুকে।তখন পুরুষেরা জীবিকার নামে দাস হবে পুজিঁর আর নারীরা বিবাহের নামে হবে যৌনদাসী।
আর মানুষ ইতিহাসের পরিনতি বলেই, লেনিন ভেংগে পড়লে এক হরিদাস পাল কবির প্রেমিকাকে বিয়ে করে নিয়ে যায় বিদেশী বনিক।
পরিনতি জানা তবু তার প্রতিক্রিয়া এত তীব্র হলো কেনো?

ভালোবাসার উষ্ণ দিন গুলোতে যে তুমি আসোনি আমার শব্দে কিংবা বাক্যে,বিরহের শীতলতায় সে তোমার কেনো এত তীব্র উপস্থিতি? আর একি বিরহ? প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাহীন প্রস্থান কি কোনো অর্থ বহন করে? এই অনর্থ যদি বিরাট অর্থবহ হয়ে দাঁড়ায়,তবে তার কোনো মানে হয়?

-----'জোছনার অন্ধকারে আমি এক অন্ধ তীরন্দাজ'
জোছনার অন্ধকার মানে কি? অন্ধ হলে তীরন্দাজ হ্য় কি করে?
এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে সুমনা যখন আমার খুব বুক ঘেষে আর আমারো রক্তে জাগছে শিকারের নেশা,তখন তুমি কেন প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে হ্যমারিং শুরু করেছিলে?কি মানে ছিলো আমার এই স্বপীড়নের,যখন তুমি ওম বিলাচ্ছো অন্য বিছানায়?
প্রতিটি পুরুষের কিছু নিজস্ব গোপন আনন্দ থাকে।মধ্যরাতের নির্ঘুম ফ্যান্টাসীতে সুমনা,তানিয়া অথবা রাস্তায় দেখা আটোসাঁটো জামার অচেনা মেয়েটা।
আমি প্রবল ভাবে চাই,তোমাকে চাই আমার নিরাভরন কল্পনায়। হৃদয়বান পুরুষের স্বর্গ তো ওখানেই। ওই স্বর্গে তোমার সাথে মিলিত হয়ে,তোমাকে ক্ষমা করে আমি বেঁচে উঠি।
সত্যি আমার তাই মনে হয়।
তুমি নেই অথচ তোমার উপস্থিতি আমাকে প্রবল ভোগায়।
আমার জরুরী হয়ে উঠে নিজের কাছে প্রমান করা যে তুমি তেমন বিশেষ কেউ নয়।
কিন্তু কি আশ্চর্য আমি আমার কল্পনায় ও বন্দী তোমার কাছে। যুক্তি ও বোধের এই প্রবল বৈপরীত্য আমাকে ক্রমশঃ অসহায়, বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ করে তুলছিল।
তোমার কাছ থেকে মুক্তি পাওয়াটা খুব জরুরী হয়ে পড়েছিল।

আর তাই...
আমি গিয়েছিলাম।
তার কাছে।তাদের একজনের কাছে।হাজার বছর ধরে যারা পুরুষের নিরুপায় অশ্লীলতাকে বরন করেছে পুঁজির মূল্যে।
মেয়েটা খুব উষ্ণ ছিল।মেয়েটা খুব কৌশলী ছিল। সে আমার সবটুকু নিংড়ে নিয়েছিল। সে আমার প্রথম ছিল।
আর সে আমাকে মুক্তি দিয়েছিল অর্থহীন আবেগ আর নিস্ফল ভালোবাসা ফাঁদ থেকে।

এখন রোজ রাতে অন্য সবার মতো তুমি ও উষ্ণতা বিলাও আমার বিলাসী অশ্লীলতায়।
ভোক্তার কাছে সকল পন্য ই যেমন ভোগ্য, মুক্তবাজারে সকল দাস-দাসী ও তাই।
তুমি এবং আমি ।।

[ কবেকার লেখা? ২০০৩ হতে পারে...]

Saturday, June 24, 2006

গুল্ম ও কুঠার

[এসব ভাবনা তোমাকেই ভেবে, প্রিয় সতেরো সেপ্টেম্বর]

খেলাটা আমি প্রথম শিখেছিলাম হাসানের কাছে ।

সেদিন আমার বিশেষ কোনো কাজ ছিলনা । তেমন থাকেনা কখনোই । ভর দুপরে হাজির হয়েছিলাম ওর অফিসে ।
ও বেশ আগ্রহ নিয়ে আমাকে বলেছিল --'একটা জিনিস দেখবি ?'
---দ্যখা । আমার আসলে আগ্রহ ছিলনা তেমন ।
তবু ওর কথামতো চোখ রেখেছিলাম কম্পিউটার স্ক্রীনে । তেমন কিছুনা । কটা আবছায়া রেখা শুধু ।
---'রেখাগুলোর মাঝখানে চারটা বিন্দু দেখছিস? ওখানে চোখ রাখ । একেবারে ৩০ সেকেন্ড । একটু ও নড়বিনা ।
চোখের পলক ফেলবি না । '
আমি তাই করলাম ।
---'এবার চোখ বন্ধ কর । ঘাড়টা একটু পেছনে হেলিয়ে দে '
আমি ওর নির্দেশ শুনি ।

প্রথমে অন্ধকার । প্রিয় অন্ধকার । একটু ফিকে ক্রমশঃ ।
একটা গোলাপী বলয় ।
তার ভেতরে কিযেন একটা । কে যেন এক!
একটা চেহারা । আসছে... যাচ্ছে... ভাসছে । ধরতে পারছিনা, পারছিনা । হঠাৎ.. স্থির ।
যেশাস! যীশুর মুখচ্ছবি । মানুষের সমস্ত পাপ ধারন করে যে ক্রুশ কাঠে বিদ্ধ করেছিল নিজেকে ।

সেদিন পরপর তিনবার কম্পিউটারে খেলাটা খেলেছি আমি । হাসান কম্পিউটারের লোক । ও কিসব লজিক টজিক দিয়ে খেলাটার একটা ব্যখ্যা দিয়েছিল আমাকে । বোঝিনি । সবকিছুর সব ব্যাখ্যা ভাল্লাগেনা আমার ।

সেদিন পুরোটাই যেন ছিল আমার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ।
হাসানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস থেকে বেরিয়ে ফুটপাতে দাঁড়াতেই প্রতীতি ও তার চার চাকার মোটর যান । ওটা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। শালার দেশটা কি আইসল্যান্ড হয়ে যাচ্ছে নাকি ? নাকি মানুষের চর্বি জমছে বেশী, তাই গরম ও বেশী বেশী!
গাড়ীতে উঠার পর প্রতীতি জানালো ও আমাকে সকাল বেলা থেকে খুঁজছে । আজ আমার জন্ম দিন ।
আহ্‌ হা ! এই মাত্র মনে পড়ল । Happy Birthday to me!
ঘুম থেকে উঠে মনে পড়লে তো নিজের গালে নিজেই একটা চুমো দেবার চেষ্টা করতাম । যায় নাকি ওরকম? নিজের গালে নিজে চুমো ? আমি কারো গালে এখনো চুমো দেইনি । আমাকে ও কেঊনা । বলবো নাকি প্রতীতিকে?
থাক্‌- বেচারা হাসান মাইন্ড করবে । নারী আর নদী কেবলি ভাংগে । গড়ে ও । কিন্তু সেতো ভাংগনের পর প্রলেপ মাত্র ।

সেই দুপুরে, আমার জন্মদিনের দুপুরে প্রতীতি আমাকে খাইয়েছিল একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেঁস্তোরায় ।
প্রতীতি আমার প্রেমিকা না।প্রতীতি কবিতা বোঝেনা।প্রতীতি প্রীতিলতাকে চেনেনা।প্রতীতি হিন্দী সিরিয়ালের পোকা।প্রতীতি আমার মাথাব্যথা।

একবার আমি কাউকে কিছু না জানিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম কয়েকদিনের জন্য। আসলে আমি চলে গিয়েছিলাম শহর ছাড়িয়ে বেশ দুরের এক চা-বাগানে। আমার এক বন্ধু ছিল ওখানে। সেই চা-বাগানের ভেতর খ্রীস্টানদের একটা কবরস্থান । রাবার গাছ ঘেরা । কি ভীষন নির্জনতা ছিল সেখানে। টুপটাপ অক্সিজেন ঝ্রে পড়ার শব্দ শুনেছিলাম আমি । রাবার গাছের বিচিগুলো অদ্ভুত সুন্দর । যেন আল্পনা আঁকা । কার কথা ভেবে যেনে কটা নিয়ে এসেছিলাম পকেটে করে ।
শহরে ঢুকতেই প্রতীতির সাথে দেখা । আমি আমার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলাম । ও গ্রহন করেছিল । হেসেছিল । হয়তো হাসিতে ভালবাসাই ছিল । কিন্তু আমি কেন যেন তাচ্ছিল্য দেখেছিলাম।

ওর বড় বেশি ভালোবাসা । শরীরে, মনে, সবকিছুতে । বালিকা বাস করে বায়ুমাঝে । বালিকা জানেনা ঘৃনা করতে না জানলে সত্যি করে ভালবাসা যায়না । যেমন চাঁদ তারাকে ঘৃনা না করলে ভালোবাসা যায়না লালসবুজকে । মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে ঘৃনা,কানকুনের বনিক সভায় ঘৃনা,ধর্ম গ্রন্থগুলোর পাতায় পাতায় ঘৃনা । প্রতীতি ওসবের খোঁজ রাখেনা ।

রেস্তোঁরায় মুখোমুখি বসে আমার চোখ পড়েছিল ওর রাজ হংসীর মত গলায় । ওখানে একটা চমৎকার তিল । ইচ্ছে হয়েছিল ওখানে চোখ রেখে ওই খেলাটা শুরু করি আবার ।প্রতীতি চোখ নামিয়েছিল কিন্তু আমার আর মনঃসংযোগ হয়নি।

সেদিন বাড়ি ফিরি আমি মাঝরাতে ।
দেয়াল টপকে ভেতর বাড়ি । শেওলা ধরা সিঁড়ি বেয়ে আমার দেড়তলার খুপড়িঘরে। নীচে বড়ভাইয়ের ঘরে বাতি নেভানো।নিষিদ্ধ শব্দমালা, ভালোবাসা অথবা ঘৃনার পদাবলী। পাশের ঘরে বাবার কাশির শব্দ । জীবনের দায়শোধ । জননী সে দায় শোধ করে চলে গেছেন আমাকে জন্ম দিতে গিয়ে ।

বহুদিন পর সেই রাতে আমার মনে পড়েছিল- এক সময় আমি ছবি আঁকতাম । পাখী,মাছ,ফুল,প্রজাপতি,ঘোমটা দেয়া বৌ। সবল মাঝি,ভালোবাসা । বিছানার নিচে তখনো ক্ষয়ে যাওয়া রংতুলি, শুকিয়ে যাওয়া রংয়ের কৌটা ।
শুকিয়ে যাওয়া রংযের কৌটায় জল ঢেলে ক্ষয়ে যাওয়া তুলি ভিজিয়ে আবছায়া কটা টান দিয়েছিলাম কোনার দেয়ালে ।
না পাখী,না মাছ,না ফুল,না প্রজাপতি,না ঘোমটা দেয়া বউ,না সবল মাঝি,না ভালোবাসা ।
আমি কেবল কটা টান দিয়েছিলাম ঘৃনার । আর তার ভেতর কটা বিপরীত ফোঁটা ছিল । ভালোবাসার ।
তারপর শুরু করেছিলাম সেই খেলাটা ।

ঘৃনার দাগের ভেতর ভালবাসার কটা ফোঁটা । সেগুলোতে চোখ রাখা একটানা । তারপর চোখ বন্ধ করে ঘাড়টা একটু পেছনে হেলে দেয়া । একটা আবছায়া গোলাপি বলয় । কিন্তু এবার আর যিশু নয় । ওখানে এক বালিকার মুখ । সেই বালিকা ফ্রেম বন্দী হয়ে আছে আমার বাবার সাথে বিয়ের ছবিতে ।

সেই রাত থেকে প্রতিরাতে এই খেলাটা খেলি আমি । সেই একই খেলা । মাঝে মাঝে মুখগুলো বদলায় শুধু ।
কখনো সে মুখ মার্গারেট ম্যাতিউস,কখনো প্যালেস্টাইনের কোনো অচেনা কিশোরী- যে বুকে বোমা বাঁধছে প্রবল ঘৃনায় তার তীব্র ভালোবাসাকে বাঁচাবে বলে ।
আমি ওখানে একটা মুখ দেখতে চাই । সে কারনেই আমার প্রতিরাতের আয়োজন ।
জানি একদিন সে মুখ আমি দেখবো নিশ্চিত । আর সেদিনই শেষ হয়ে যাবে আমার এ খেলা ।
আমার আশ্চর্য উদ্ধার । ।

[২০০২ এর কোন একদিন লেখা ]